প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সরকারকে সময় থাকতে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম। তিনি বলেছেন, সরকারের বর্তমান কর্মকাণ্ডের দায় শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকেই নিতে হবে। এখন যারা প্রধানমন্ত্রীর পাশে রয়েছেন, পরিস্থিতি কঠিন হলে তাঁদের অনেকেই সরে যেতে পারেন। তখন কেউ দায় স্বীকার করবেন না। তাই সময় থাকতে ভুল সংশোধন করে দেশ পরিচালনায় সঠিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন অলি আহমেদ। তাঁর বক্তব্যে সরকারের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু সমালোচনা করা নয়; সরকারকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টাও তাদের দায়িত্বের অংশ।
অলি আহমেদ বলেন, কয়েক মাস ধরে তাঁরা বিভিন্ন সভা-সমাবেশের মাধ্যমে সরকারকে নানা বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন। বারবার বৈঠক ও সমাবেশ করে মানুষের সামনে বক্তব্য তুলে ধরলেও প্রত্যাশিত পরিবর্তন হচ্ছে না বলে তাঁর অভিযোগ। তিনি দাবি করেন, তাঁদের এসব বক্তব্য ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে নয়; বরং অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের জায়গা থেকেই তাঁরা সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছেন। দেশ যেন সঠিক পথে পরিচালিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মের ভিত্তিতে কাজ করতে পারে, সেটিই তাঁদের প্রত্যাশা।
রাষ্ট্র পরিচালনায় কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে এলডিপি চেয়ারম্যান বলেন, দেশের প্রতিটি সরকারি অফিস ও পদ পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকা উচিত। তাঁর মতে, কোনো রাষ্ট্রের অগ্রগতি নির্ভর করে শুধু সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের ওপর নয়; বরং প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা নিয়মতান্ত্রিক ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তার ওপরও নির্ভর করে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ম ও কাঠামো সচল থাকে।
বাংলাদেশে এমন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দুর্বল বলে অভিযোগ করেন অলি আহমেদ। তাঁর দাবি, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন জেলা কার্যালয়, জেলা পরিষদ, করপোরেশন, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় দলীয় প্রভাব বেড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান কার্যত বিএনপির কার্যালয়ে পরিণত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর অভিযোগ, সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রভাব বিস্তারের কারণে প্রশাসনিক কার্যক্রমের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের পাশাপাশি টেন্ডার ও স্থানীয় ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও তুলে ধরেন এলডিপি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারের উন্নয়নকাজের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়িক সুবিধা দখল এবং বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে। কোথায় কোন দরপত্রের সুযোগ রয়েছে, কোথায় কার ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত কিংবা কোন এলাকায় কী ধরনের সমস্যা রয়েছে—এসব বিষয়ে দলীয় লোকজন হস্তক্ষেপ করছেন বলে তাঁর অভিযোগ। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি সমাবেশে নির্দিষ্ট কোনো নথি বা ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ উপস্থাপন করেননি। ফলে বিষয়গুলো রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে এগুলোর সত্যতা যাচাই প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে অলি আহমেদ বলেন, সরকারের সব সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের চূড়ান্ত রাজনৈতিক দায়ভার প্রধানমন্ত্রীর ওপরই বর্তাবে। বর্তমানে যাঁরা তাঁর সঙ্গে রয়েছেন, পরিস্থিতি প্রতিকূল হলে তাঁরা নিজেদের দায় এড়িয়ে যেতে পারেন। তখন প্রধানমন্ত্রীকে একাই জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, সরকারপ্রধানের উচিত এখনই ভুলগুলো চিহ্নিত করে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া। একই ভুল বারবার করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বক্তব্যে ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গও টেনে আনেন সাবেক এই মন্ত্রী। তিনি বলেন, ওই সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে বিএনপি বিরোধীদের দাবি উপেক্ষা করেছিল। পরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে রাত জেগে আইন পাস করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। বর্তমান সরকারও যদি বিরোধী দলের বক্তব্য ও সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে, তাহলে অতীতের মতো সংকট আবার দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, রাজনৈতিক বিরোধ ও রাষ্ট্রীয় সংকটকে সময়মতো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না করলে তা একপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
অলি আহমেদ বলেন, বিরোধী দলের অন্যতম দায়িত্ব হলো সরকারকে সঠিক পথে পরিচালিত হতে সহায়তা করা এবং ভুল সিদ্ধান্তের বিষয়ে সতর্ক করা। তাঁদের বক্তব্যকে সরকারের বিরুদ্ধে কেবল রাজনৈতিক বিরোধিতা হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের স্বার্থে দেওয়া পরামর্শ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি। তবে তিনি সতর্ক করেন, সরকার যদি কোনো পরামর্শই গ্রহণ না করে এবং একইভাবে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে থাকে, তাহলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে এলডিপি চেয়ারম্যান বলেন, ভালো ও যোগ্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্র পরিচালনা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। তাঁর মতে, যাঁরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানেন এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা রাখেন, তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। দেশ পরিচালনায় দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বশীলতার সমন্বয় না থাকলে প্রশাসনিক দুর্বলতা তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দেশের মানুষ শান্তিতে থাকতে চায়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন নিয়ম মেনে চলে এবং সাধারণ মানুষ যেন নিরাপদ ও স্বস্তিপূর্ণ পরিবেশে জীবনযাপন করতে পারে, সেটিই হওয়া উচিত সবার লক্ষ্য। সরকারের প্রতি তাঁর আহ্বান, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে উপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় আলোচনা ও পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে।
সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমির মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম ছোবহানী, আমার বাংলাদেশ পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম এবং ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দামসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারাও সমাবেশে অংশ নেন।
১১ দলীয় ঐক্যের এই কর্মসূচিতে অলি আহমেদের বক্তব্য সরকারের প্রতি রাজনৈতিক চাপ ও সতর্কবার্তার অংশ হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা, সরকারি সম্পদের ব্যবস্থাপনা এবং দলীয় প্রভাবের অভিযোগ তাঁর বক্তব্যে সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারের অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে বিতর্কের প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা যেকোনো সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি দপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে পারলে নাগরিক সেবা, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে দলীয় প্রভাব বা অনিয়মের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত না হলে জনমনে অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে। তাই অলি আহমেদের উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পাশাপাশি সরকারের কার্যক্রম ও বাস্তব পরিস্থিতিও নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকারের প্রতি বিরোধী দলগুলোর এমন সতর্কবার্তা ভবিষ্যতে কী প্রভাব ফেলে, তা নির্ভর করবে সরকার এসব বক্তব্য কীভাবে বিবেচনা করে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় তার ওপর। অলি আহমেদ যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তার মূল বক্তব্য হলো—সংকট গভীর হওয়ার আগে ভুল সংশোধন, অভিজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মের মধ্যে পরিচালনা করা জরুরি। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সাধারণ মানুষের স্বার্থে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে দায়িত্বশীল সংলাপ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত