প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে যুদ্ধের অবসান কীভাবে ঘটবে, কিংবা দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার জন্য কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি। একদিকে ট্রাম্পের বক্তব্যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও পুরোপুরি কাটেনি। ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ ও কৌতূহল দুটোই বাড়ছে।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটির বেতারকেন্দ্র কেসিএমওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হতে যাচ্ছে। তবে এ সংঘাতের অবসানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়তা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে চায় ওয়াশিংটন। ট্রাম্পের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে ট্রাম্পের এমন মন্তব্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা। কারণ, ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির মধ্যে একটি জটিল সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প এর আগে নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে হামলা চালানো হবে না বলে জানিয়েছিলেন। তবে নির্বাচনের পর পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, সে বিষয়ে তাঁর প্রশাসনের অবস্থান পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কূটনৈতিক উদ্যোগও জোরদার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে কাতার। শুক্রবার কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা আবারও তেহরানে যান। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই এ উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে। কাতারের এই তৎপরতার লক্ষ্য হলো দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পথ তৈরি করা এবং নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার ঝুঁকি কমানো।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বরাতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান মতপার্থক্য কমানোর চেষ্টা করছেন। আলোচনায় এমন একটি কাঠামো তৈরির বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে, যার মাধ্যমে উভয় পক্ষ ধাপে ধাপে কিছু পদক্ষেপ নিয়ে সরাসরি আলোচনায় ফিরতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। দুই দেশের অবস্থানের ব্যবধানই আলোচনাকে কঠিন করে তুলছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহসেন রেজাইয়ের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ভ্যান্সের পক্ষ থেকে পাঠানো একটি চিঠির মাধ্যমে আলোচনার নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রস্তাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা রয়েছে। তবে ইরান এখনো এ প্রস্তাবের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি।
ভ্যান্সের উদ্যোগকে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হবে কি না, কিংবা আলোচনায় বসলে কোন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন, তা এখনো অনিশ্চিত। অতীতের আলোচনা ও সমঝোতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট রয়েছে। সেই অবিশ্বাস দূর করা ছাড়া স্থায়ী কোনো সমাধানে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
সমঝোতার পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ। যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ছেড়ে দিক অথবা এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করুক, যাতে দেশটির পক্ষে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব না হয়। ওয়াশিংটনের কাছে এ বিষয়টি কেবল দ্বিপক্ষীয় বিরোধ নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক বিস্তার রোধের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
অন্যদিকে ইরান আলোচনার আগে নিজেদের ওপর আরোপিত চাপ কমানোর দাবি জানাচ্ছে। তেহরানের অবস্থান অনুযায়ী, দেশটির বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নিতে হবে এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদ ফিরিয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের হামলা বন্ধের নিশ্চয়তাও ইরানের আলোচনার শর্তের মধ্যে রয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জানিয়েছেন, এসব শর্ত পূরণ না হলে সমঝোতায় অগ্রগতি অর্জন কঠিন হবে।
দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি শর্ত আলোচনাকে জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে পারমাণবিক বিষয়ে নিশ্চয়তা চাইলেও ইরান আগে অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। ফলে কে আগে ছাড় দেবে, সেটিই এখন আলোচনার অন্যতম প্রধান প্রশ্ন। কোনো পক্ষই নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান থেকে সরে আসতে রাজি না হলে মধ্যস্থতাকারীদের জন্য সমঝোতার পথ তৈরি করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি সামরিক প্রস্তুতির খবরও পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার ইরানে নতুন করে হামলার সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে ট্রাম্পকে অবহিত করেছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে সম্ভাব্য যৌথ সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা তৈরি করেছে বলেও খবর এসেছে। সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য হিসেবে ইরানের নেতৃত্ব, জ্বালানি অবকাঠামো, পারমাণবিক স্থাপনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইরান পাল্টা হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামো, সমুদ্রপথ ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটে হামলার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ইতিমধ্যে সংঘাতের কারণে আঞ্চলিক নৌ চলাচল ও জ্বালানি পরিবহনে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
যুদ্ধের দীর্ঘায়িত প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। নিরাপত্তাহীনতা, বাস্তুচ্যুতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ সংঘাতকবলিত অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। নতুন করে হামলা শুরু হলে বেসামরিক মানুষের জীবন, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই কেবল সামরিক লক্ষ্য অর্জন নয়, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও যেকোনো সমঝোতার গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হওয়া প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনও এ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নির্বাচনের আগে বড় ধরনের সামরিক অভিযান এড়িয়ে চলার ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে নির্বাচন শেষ হওয়ার পর তাঁর প্রশাসন কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের পর নতুন করে হামলার সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। যদিও ট্রাম্প এখনো যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার আশা প্রকাশ করছেন, তাঁর প্রশাসনের সামরিক প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ পাশাপাশি চলায় পরিস্থিতি নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের অবসান নির্ভর করছে দুই দেশের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান এবং অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ কমানোর বিষয়ে সমঝোতার ওপর। কাতারের মধ্যস্থতা এবং ভ্যান্সের সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব কূটনৈতিক অগ্রগতির সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে দুই পক্ষের শর্তের ব্যবধান কমানো না গেলে সেই সুযোগ কাজে লাগানো কঠিন হবে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আশাবাদ থাকলেও বাস্তবে সংঘাতের অবসান এখনো নিশ্চিত নয়। আগামী কয়েক দিন কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনা, ইরানের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফল—সবকিছুই পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমঝোতা সফল হবে, নাকি নির্বাচনের পর নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হবে, তার উত্তর এখনো অজানা। তবে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং লাখো মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে যুদ্ধের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের প্রত্যাশাই আন্তর্জাতিক মহলে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত