প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভূতুড়ে পোশাক, কুমড়োর ভেতরে জ্বলতে থাকা আলো, রহস্যময় সাজসজ্জা আর বাড়ি বাড়ি ঘুরে মিষ্টি সংগ্রহ—প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন নানা আয়োজনে পালিত হয় হ্যালোইন। শিশু-কিশোরদের কাছে এটি আনন্দ ও কল্পনার উৎসব, আবার তরুণদের কাছে ভিন্নধর্মী পোশাক, সাজসজ্জা এবং বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর বিশেষ উপলক্ষ। কেউ সাজেন ভূত, ডাইনি কিংবা ভ্যাম্পায়ার, কেউ আবার জনপ্রিয় সিনেমা বা কার্টুনের চরিত্রের আদলে নিজেকে উপস্থাপন করেন। তবে আধুনিক এই আনন্দ-আয়োজনের পেছনে রয়েছে প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাস, প্রাচীন ধর্মীয় বিশ্বাস, লোককথা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের দীর্ঘ কাহিনি।
হ্যালোইনের শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় প্রাচীন কেল্টিক জনগোষ্ঠীর কাছে। প্রায় দুই হাজার বছর আগে বর্তমান আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য এবং উত্তর ফ্রান্সের কিছু অঞ্চলে বসবাসকারী কেল্টিকরা ‘সামহেইন’ নামে একটি উৎসব পালন করত। প্রতিবছর ৩১ অক্টোবর সূর্যাস্তের পর শুরু হতো এই উৎসব। এটি ছিল মূলত ফসল কাটার মৌসুমের সমাপ্তি এবং শীতের আগমনের প্রস্তুতি। কৃষিনির্ভর জীবনে ঋতু পরিবর্তন মানুষের দৈনন্দিন জীবন, খাদ্যসংস্থান ও নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। তাই সামহেইন শুধু একটি উৎসব ছিল না; বরং প্রকৃতির পরিবর্তনকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাস, ভয় এবং সামাজিক ঐক্যেরও প্রতিফলন ছিল।
কেল্টিকদের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, সামহেইনের রাতে জীবিত মানুষ ও মৃতদের জগতের মধ্যকার সীমারেখা অনেকটা অস্পষ্ট হয়ে আসত। তাঁদের ধারণা ছিল, এ সময় মৃত মানুষের আত্মা পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারে। অশুভ আত্মা বা অতিপ্রাকৃত শক্তির ক্ষতি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে তাঁরা বড় বড় আগুন জ্বালাতেন, বিশেষ ধরনের পোশাক পরতেন এবং বিভিন্ন আচার পালন করতেন। আগুনকে তাঁরা অন্ধকার ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করতেন। যদিও এসব বিশ্বাস আধুনিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠিত নয়, তবু প্রাচীন সমাজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে এগুলোর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল।
সময়ের সঙ্গে ইউরোপে খ্রিষ্টধর্মের বিস্তার ঘটে। এর প্রভাবে স্থানীয় বিভিন্ন ধর্মীয় ও লোকজ উৎসবের সঙ্গে খ্রিষ্টীয় আচার-অনুষ্ঠানের মেলবন্ধন তৈরি হতে থাকে। অষ্টম শতকে পোপ তৃতীয় গ্রেগরি ১ নভেম্বরকে ‘অল সেইন্টস ডে’ বা সব সাধুর দিবস হিসেবে নির্ধারণ করেন। এই দিবসের আগের সন্ধ্যা পরিচিত হয় ‘অল হ্যালোজ ইভ’ নামে। পরবর্তী সময়ে শব্দটি সংক্ষিপ্ত হয়ে ‘হ্যালোইন’ রূপ পায়। এভাবেই প্রাচীন কেল্টিক সামহেইন, খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকবিশ্বাসের মিশ্রণে উৎসবটির পরিচিতি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।
হ্যালোইনের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকগুলোর একটি হলো ভেতরে আলো জ্বালানো খোদাই করা কুমড়ো। ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘জ্যাক-ও’-ল্যান্টার্ন’। কুমড়োর গায়ে চোখ, নাক ও মুখের আকৃতি কেটে ভেতরে মোমবাতি বা আলো রাখা হয়। অন্ধকারে জ্বলতে থাকা এসব কুমড়ো উৎসবের পরিবেশকে যেমন রহস্যময় করে তোলে, তেমনি হ্যালোইনের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এই প্রতীকের পেছনে রয়েছে আয়ারল্যান্ডের একটি পুরোনো লোককথা।
লোককথা অনুযায়ী, স্টিঞ্জি জ্যাক নামে এক ব্যক্তি শয়তানকে ধোঁকা দিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর স্বর্গ ও নরক—কোনো জায়গাতেই তাঁর স্থান হয়নি। ফলে তাঁকে অন্ধকার পথে ঘুরে বেড়াতে হয়। পথ আলোকিত করার জন্য তিনি একটি খোদাই করা শালগমের ভেতরে জ্বলন্ত কয়লা রাখতেন। এই গল্প থেকেই আইরিশদের মধ্যে শালগমসহ বিভিন্ন সবজিতে মুখ খোদাই করে আলো রাখার প্রথা প্রচলিত হয় বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে আইরিশ অভিবাসীরা উত্তর আমেরিকায় গিয়ে দেখতে পান, সেখানে কুমড়ো সহজলভ্য এবং আকারেও বড়। ফলে শালগমের পরিবর্তে কুমড়োই হয়ে ওঠে জ্যাক-ও’-ল্যান্টার্ন তৈরির প্রধান উপকরণ। সময়ের সঙ্গে এই কুমড়ো হ্যালোইনের অন্যতম জনপ্রিয় প্রতীকে পরিণত হয়।
উনিশ শতকে ইউরোপ থেকে বিপুলসংখ্যক আইরিশ ও স্কটিশ অভিবাসী উত্তর আমেরিকায় পাড়ি জমান। তাঁদের সঙ্গে নতুন ভূখণ্ডে পৌঁছে যায় হ্যালোইনের নানা লোকজ ঐতিহ্য। অভিবাসীদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে এসব প্রথা নতুনভাবে জায়গা করে নেয়। ধীরে ধীরে উৎসবটি ধর্মীয় আচার ও প্রাচীন লোকবিশ্বাসের গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক আনন্দ-আয়োজনে রূপান্তরিত হতে থাকে। বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রে হ্যালোইনের জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে বাড়ে। শিশুদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে মিষ্টি সংগ্রহের প্রথা ‘ট্রিক অর ট্রিট’ বিশেষ পরিচিতি লাভ করে।
ট্রিক অর ট্রিটের সময় শিশুরা ভূত, ডাইনি, কঙ্কাল, ভ্যাম্পায়ার কিংবা নানা কাল্পনিক চরিত্রের পোশাক পরে প্রতিবেশীদের বাড়িতে যায়। দরজায় কড়া নেড়ে তারা মিষ্টি বা উপহার চায়। এই প্রথার নামের মধ্যে মজার ছলে দুষ্টুমি করার একটি ইঙ্গিত রয়েছে। তবে আধুনিক সময়ে এটি মূলত শিশুদের আনন্দ, সামাজিক যোগাযোগ এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে সৌহার্দ্য তৈরির একটি আয়োজন হিসেবে পরিচিত। অনেক এলাকায় পরিবারগুলো শিশুদের জন্য বিশেষভাবে মিষ্টি ও উপহার প্রস্তুত রাখে। বাড়ির সামনে কুমড়োর আলো, কৃত্রিম মাকড়সার জাল ও ভৌতিক সাজসজ্জা তৈরি করে উৎসবের পরিবেশ আরও আকর্ষণীয় করে তোলা হয়।
হ্যালোইনে ভয়ংকর পোশাক পরার ঐতিহ্যের সঙ্গেও প্রাচীন সামহেইনের বিশ্বাসের যোগ রয়েছে। কেল্টিকদের ধারণা ছিল, বছরের এই সময়ে অশুভ আত্মারা পৃথিবীতে বিচরণ করতে পারে। তাই মানুষ ভীতিকর পোশাক ও মুখোশ ব্যবহার করে নিজেদের পরিচয় আড়াল করার চেষ্টা করত। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, এতে আত্মারা মানুষকে চিনতে পারবে না বা ক্ষতি করতে পারবে না। সময়ের পরিবর্তনে সেই বিশ্বাসভিত্তিক প্রথা বিনোদনের অংশ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে ভূত, ডাইনি বা দানবের পাশাপাশি জনপ্রিয় সিনেমা, টেলিভিশন, কমিকস, কার্টুন এবং ইতিহাসের বিভিন্ন চরিত্রের পোশাকও হ্যালোইনের আয়োজনে দেখা যায়। শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক—সব বয়সের মানুষই নিজের পছন্দ অনুযায়ী সাজতে পারেন।
একুশ শতকে হ্যালোইন একটি বড় বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক আয়োজনে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ উপলক্ষে থিম পার্টি, কস্টিউম প্রতিযোগিতা, ভৌতিক বাড়ি, কুমড়ো খোদাই এবং বিশেষ চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। পোশাক, মুখোশ, কৃত্রিম সাজসজ্জা, মিষ্টি ও উপহারসামগ্রীর বাজারেও এ সময় বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ড উৎসবকে কেন্দ্র করে বিশেষ পণ্য বাজারজাত করে। ফলে হ্যালোইন এখন শুধু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নয়, অনেক দেশের বিনোদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশে হ্যালোইন এখনো ঈদ, পূজা বা পয়লা বৈশাখের মতো প্রচলিত সামাজিক ও ঐতিহ্যবাহী উৎসব নয়। তবে বিশ্বায়ন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক বিনোদনজগতের প্রভাবে এ সম্পর্কে মানুষের পরিচিতি বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হ্যালোইন নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও বিনোদনকেন্দ্রে এ উপলক্ষে বিশেষ সাজসজ্জা, কস্টিউম পার্টি এবং থিমভিত্তিক আয়োজন দেখা যায়। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের সাজসজ্জার ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন। তবে এসব আয়োজন এখনো সীমিত পরিসরেই রয়েছে।
হ্যালোইনকে ঘিরে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও একরকম নয়। কারও কাছে এটি কেবল বিনোদন ও সৃজনশীলতার উৎসব, আবার কেউ এর প্রাচীন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক শিকড়ের কারণে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখেন। বিভিন্ন সমাজে ধর্মীয় বিশ্বাস, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে উৎসবটি পালনের ধরনও আলাদা। ফলে হ্যালোইনের ইতিহাস বুঝতে হলে শুধু ভূতুড়ে সাজসজ্জা বা মিষ্টি সংগ্রহের দৃশ্য দেখলেই চলে না; এর পেছনে থাকা মানুষের প্রকৃতিনির্ভর জীবন, মৃত্যু নিয়ে ভাবনা, ধর্মীয় পরিবর্তন এবং অভিবাসনের ইতিহাসও বিবেচনায় নিতে হয়।
প্রায় দুই হাজার বছর আগে ঋতু পরিবর্তন ও মৃত আত্মাদের ঘিরে প্রচলিত বিশ্বাস থেকে যে সামহেইন উৎসবের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সময়ের প্রবাহে তা নানা সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে বদলে গেছে। শালগমের আলো জায়গা ছেড়েছে কুমড়োর কাছে, প্রাচীন মুখোশের জায়গায় এসেছে সিনেমার চরিত্রের পোশাক, আর ধর্মীয় ও লোকজ আচার রূপ নিয়েছে সামাজিক বিনোদনে। হ্যালোইনের এই দীর্ঘ যাত্রা দেখায়, মানুষের সংস্কৃতি কখনো স্থির থাকে না; সময়, স্থান ও প্রজন্মের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো ঐতিহ্যও নতুন অর্থ ও পরিচয় লাভ করে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত