প্রকাশ: ২৪শে জুন, ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ভারতের উড়িষ্যায় ঘটে যাওয়া একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা আবারও দেশটির তথাকথিত ‘গো-রক্ষক’দের বর্বর ও বর্ণবাদী মানসিকতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবির সূত্র ধরে এই ঘটনাটি এখন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পরিসরে নিন্দা ও উদ্বেগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
ঘটনার কেন্দ্রে আছেন দুই দলিত পুরুষ—বয়স যথাক্রমে ৫৪ ও ৪২ বছর। তারা তাদের নিজ রাজ্য উড়িষ্যার পথে ফিরছিলেন। একজনের মেয়ের বিয়ের জন্য তারা উপহার হিসেবে একটি গরু ও একটি বাছুর কিনেছিলেন। হ্যাঁ, শুধু গরু কেনা—এইটিই তাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন ভুল বলে ধরে নিয়েছিল উগ্র হিন্দুত্ববাদী বজরঙ দলের কিছু সদস্য, যারা নিজেদের পরিচয় দেয় ‘গো-রক্ষক’ হিসেবে।
সফরের পথে হঠাৎ একদল বজরঙ দলের কর্মী তাদের গতিরোধ করে। প্রথমে তাদের পরিচয় জানতে চাওয়া হয়, পরে গরুর সাথে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। একপর্যায়ে প্রশ্নগুলো গায়ে-গতরে ঘৃণা ও বিদ্বেষে রূপ নেয়। গরু কেনার ‘অপরাধে’ দলিত পরিচয়ের এই দুই মানুষকে প্রাণীর মতো শাস্তি দেওয়া হয়—একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যা কল্পনা করাও কঠিন।
দুজনকে জোর করে মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হয়। এরপর কুকুরের মতো হামাগুড়ি দিয়ে চলতে বাধ্য করা হয় দীর্ঘ পথ—প্রায় আধা কিলোমিটার। শুধু তাই নয়, তাদের ঘাস খেতে বাধ্য করা হয়, এমনকি মুখে ঢেলে দেওয়া হয় নর্দমার দূষিত পানি। সেই সময় আশপাশে যারা দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাদের কেউই প্রতিরোধে এগিয়ে আসেনি। বরং এই অপমান ও নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করা হয়েছে এবং ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অনলাইনে, যেন তাদের মানসিক ভাঙনকে আরও গভীর করে তোলা যায়।
এই ঘটনায় ভারতের নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। বারবার এমন বর্বরতা দেখেও প্রশাসনের নীরবতা বা বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেছে ভারতীয় গণতন্ত্রের এক অন্ধকারময় দিক।
এই ধরনের ঘটনার নেপথ্যে যে জাতপাত-ভিত্তিক ঘৃণার সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় উগ্রতার রাজনীতি কাজ করে চলেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ আর নেই। ভারতের সংবিধান যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা, ব্যক্তিগত অধিকার এবং সমানাধিকারের নিশ্চয়তা দেয়, সেখানে ‘গো-রক্ষা’র নামে দলিতদের কুকুরের মতো হাঁটানো—শুধু সংবিধান লঙ্ঘন নয়, বরং মানবিকতারই চরম অবমাননা।
বিষয়টি শুধু উড়িষ্যা কিংবা ভারতের কোনো একটি অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গরু সংক্রান্ত অভিযোগ তুলে দলিত, মুসলিম কিংবা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের উপর যেভাবে সহিংসতা চালানো হয়েছে, তা ভারতকে জাতিগত ও ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে দাবি করা ভারতের এই বর্ণবাদী ও মৌলবাদী ধারা এখন মানবাধিকারের পরিপন্থী বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। ইউএন মানবাধিকার পরিষদসহ আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো বারবার এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও দেশটির শাসনব্যবস্থা কখনোই কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং অনেকক্ষেত্রে অভিযুক্তদের রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিতেও দেখা গেছে।
অথচ দলিত সম্প্রদায়, যাদের অবদানে ভারতের কৃষি, পরিকাঠামো এবং অর্থনীতি আজও টিকে আছে, তারাই বারবার সমাজের অবহেলা, নিপীড়ন ও অপমানের শিকার হচ্ছেন। ২০২৫ সালের ভারতে এসে দলিতদের উপর এই ধরনের নিগ্রহ প্রমাণ করে, রাষ্ট্রের মূল কাঠামোতে এখনো বর্ণবাদ গেঁথে আছে বিষাক্ত শিকড়ের মতো।
এই ঘটনাটি স্মরণ করিয়ে দেয়—ভারত আজ একটি রাষ্ট্র নয়, বরং একটি গভীর বর্ণবাদী বাস্তবতার চিত্র। যেখানে ধর্ম, জাতপাত ও গায়ের রং বিচার করে মানুষকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এই বাস্তবতা মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও সমতার ধারণাকে প্রতিদিন চ্যালেঞ্জ করছে।
মানবতার পক্ষে দাঁড়ানো প্রতিটি কণ্ঠের এখন সময় এসেছে প্রশ্ন তোলার, প্রতিবাদ জানানোর এবং পরিবর্তনের দাবি তোলার। কারণ যদি সভ্যতার দাবি থাকে—তাহলে এই ধরনের নৃশংসতা আর গ্রহণযোগ্য নয়। আজ যদি এই নির্যাতনকে উপেক্ষা করা হয়, কাল এ সমাজের আরেকটি প্রান্তে জন্ম নেবে আরও বড় বর্বরতা।
এটাই এখনো ‘সভ্য’ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।








