ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে সকালে এই খাবারগুলো এড়ানো জরুরি

নিজস্ব সংবাদদাতা
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৮ জুন, ২০২৫
  • ৩২ বার
ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে সকালে এই খাবারগুলো এড়ানো জরুরি

প্রকাশ: ২৮শে জুন, ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ডায়াবেটিস—একটি দীর্ঘমেয়াদী রোগ, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে নানা ধরনের জটিলতা ডেকে আনতে পারে। বিশ্বজুড়ে এই রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে এবং বাংলাদেশেও এর প্রভাব উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে ওষুধ বা ইনসুলিনের পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস। বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনের শুরুতেই কিছু ভুল খাবার খাওয়ার ফলে সারা দিনের রক্তে গ্লুকোজের ওঠানামা ভয়াবহভাবে প্রভাবিত হতে পারে। সেই ভুলগুলোর মধ্যে রয়েছে এমন কয়েকটি খাবার, যেগুলো অনেকেই সচেতনতা ছাড়াই প্রতিদিন সকালে খেয়ে থাকেন।

পুষ্টিবিদ ও অন্তঃক্রিয়াবিদরা বলছেন, দিনের প্রথম খাবার শুধু ক্ষুধা মেটানোর বিষয় নয়, এটি শরীরের রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক এক গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। সেক্ষেত্রে ভুল খাবার বেছে নেওয়া হলে দিনের বাকি অংশে গ্লুকোজ লেভেল ওঠানামা করতে থাকে এবং ওষুধ বা ইনসুলিনের কার্যকারিতাও ব্যাহত হয়।

যেমন, অনেকেই দিনের শুরু করেন এক কাপ চা দিয়ে, তাও দুধ চা। যদিও এটি অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ, তবে ডায়াবেটিস আক্রান্তদের জন্য এটি হতে পারে বিপজ্জনক। দুধে থাকা ল্যাকটোজ অনেকের জন্য হজম করা কঠিন হয়। পেটে গ্যাস, ফাঁপা ভাব এমনকি ডায়রিয়ার মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে। শুধু তাই নয়, দুধে থাকা কেসিন নামক একধরনের প্রোটিন অন্ত্রে প্রদাহ তৈরি করতে পারে, যার ফলে ‘লিকি গাট’ নামক সমস্যা হতে পারে, এবং বিষাক্ত পদার্থ রক্তে প্রবেশ করতে পারে, যা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য মারাত্মক হুমকি।

আরেকটি সাধারণ ভুল হলো—প্যাকেটজাত ফলের রস পান করা। অনেকেই মনে করেন ফলের রস স্বাস্থ্যকর, কিন্তু বাস্তব হলো—এগুলোতে ফাইবার একেবারেই থাকে না। ফলের প্রাকৃতিক চিনি বা ফ্রুকটোজ যখন ফাইবার ছাড়া সরাসরি শরীরে প্রবেশ করে, তখন তা দ্রুত রক্তে গ্লুকোজ বাড়িয়ে দেয়। এই হঠাৎ বৃদ্ধি শরীরকে ধাক্কা দিয়ে ক্লান্তি, ক্ষুধা এবং অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি করে। ফলে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে।

তৃতীয় ভুলটি হলো সকালে খালি পেটে রুটি খাওয়া—বিশেষ করে পরিশোধিত ময়দা বা সাদা রুটি। এগুলো রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বাড়িয়ে তোলে, কারণ শরীরে ঢুকেই এগুলো সহজেই চিনিতে রূপান্তরিত হয়। বিশেষ করে খালি পেটে এই ধরনের রুটি খেলে তা আরও তাড়াতাড়ি রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ফলস্বরূপ, হজম প্রক্রিয়ায় সমস্যা হয় এবং দিনের বাকি অংশজুড়ে গ্লুকোজ লেভেল অস্থিতিশীল থাকে।

সবশেষে আসে ইলেক্ট্রোলাইট বা স্পোর্টস ড্রিংকসের প্রসঙ্গ। বাজারে এসব পানীয়কে অনেক সময় স্বাস্থ্যকর বা ‘রিহাইড্রেটিং’ পানীয় হিসেবে প্রচার করা হলেও অধিকাংশ পণ্যতেই থাকে কৃত্রিম মিষ্টি, যেমন সুক্রালোজ। এসব কেমিক্যাল অন্ত্রের স্বাভাবিক মাইক্রোবায়োম বা জীবাণুজগতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। এর ফলে হজমে সমস্যা হয় এবং গ্লুকোজ মেটাবলিজমে বাধা পড়ে। সকালে খালি পেটে এগুলো পান করা হলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত ওঠানামা করে, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

স্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ও চিকিৎসাবিজ্ঞান জার্নালে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি গবেষণাতেও দেখা গেছে, ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে সকালে সঠিক খাদ্য নির্বাচন না করলে সারাদিনের ইনসুলিন সেনসিটিভিটি ও গ্লুকোজ লেভেলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এজন্য শুধু ওষুধ বা চিকিৎসকের পরামর্শ নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও খাদ্যাভ্যাসে যথাযথ পরিবর্তন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, দিনের শুরুতে ফাইবার সমৃদ্ধ ও প্রাকৃতিক খাবার বেছে নেওয়া উচিত। যেমন—ওটস, গোটা শস্যজাত খাবার, কম মিষ্টিযুক্ত ফল, বাদাম, ডিম ইত্যাদি। এ ধরনের খাবার ধীরে হজম হয় এবং ধীরে ধীরে গ্লুকোজ মুক্তি দেয় শরীরে, ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল থাকে।

সর্বোপরি, ডায়াবেটিস কোনো একদিনে হওয়া রোগ নয়, তেমনি এটি একদিনে নিয়ন্ত্রণেও আসবে না। তবে নিয়মিত সচেতনতা ও প্রতিদিনের খাবার বাছাইয়ে যত্নশীল হলে এই রোগকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। আর দিনের শুরুটা যদি হয় ঠিকমতো, তবে সারাদিনই শরীর ও মনের ভারসাম্য বজায় থাকবে—এটাই আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম শিক্ষা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত