প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মালয়েশিয়ার চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে দেশকে এগিয়ে নিতে নতুন ও কার্যকর নেতৃত্বের প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রধান বিরোধী জোট পেরিকাতান নাসিওনালের (পিএন) চেয়ারম্যান ড. আহমদ সামসুরি মোখতার। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক শ্লোগান বা ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমেই মালয়েশিয়াকে সংকট থেকে উদ্ধার করা সম্ভব।
শনিবার (২৩ মে) রাজধানী কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত Gerakan Party 58th Anniversary Conference–এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে দলীয় নেতাকর্মী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।
ড. সামসুরি মোখতার বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তন মালয়েশিয়ার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সবসময় স্থিতিশীল ও নিরাপদ পরিবেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। তাই রাজনৈতিক অস্থিরতা যত দীর্ঘ হবে, ততই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে। তার মতে, শক্তিশালী ও নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্বই পারে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে।
বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা বুঝতে পারছে, শুধু স্লোগান বা প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোনো দেশকে এগিয়ে নেওয়া যায় না। বাস্তব কাজ ও কার্যকর প্রশাসন ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই এখন সময় এসেছে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার।
পিএন চেয়ারম্যান দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিতামূলক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংবিধান অক্ষুণ্ণ রাখা এবং সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব।
বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ার অবস্থান ধরে রাখতে হলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য বিদেশি পুঁজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সেই বিনিয়োগ ধরে রাখতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।
অনুষ্ঠানে তিনি জোটের অন্যতম শরিক দল Gerakan Party–কে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। তিনি দলটির দীর্ঘ ৫৮ বছরের ইতিহাসকে মধ্যপন্থি রাজনীতির প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, মালয়েশিয়ার বহুজাতিক সমাজে গেরাকান গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে।
তিনি রাজনৈতিক কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, রাজনীতিতে জয়-পরাজয় স্বাভাবিক বিষয়। তবে ব্যর্থতার পর থেমে না গিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। ধৈর্য, ঐক্য এবং দৃঢ় মনোবলই একটি রাজনৈতিক শক্তিকে টিকিয়ে রাখে।
এদিকে পিএন জোটের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে টানাপোড়েনও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জোটের শরিক দল Malaysian Islamic Party (পাস) এবং Malaysian United Indigenous Party–এর মধ্যে কিছু বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
পাস সভাপতি আব্দুল হাদি আওয়াং অভিযোগ করেছেন, বারসাতুর কিছু একক সিদ্ধান্ত জোটের মূল নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। এ নিয়ে দলের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি সমাধানে আগামী এক বা দুই দিনের মধ্যে পাসের একটি জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে।
দলের মহাসচিব তাকিউদ্দীন হাসান জানিয়েছেন, বৈঠকে বারসাতুর সঙ্গে ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এরপর গৃহীত সিদ্ধান্ত জোটের কেন্দ্রীয় বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে, যেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক ধরনের পুনর্গঠনের পর্যায়ে রয়েছে। জোটের ভেতরের এই মতবিরোধ ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে আসন্ন রাজনৈতিক সমীকরণ ও নির্বাচনী কৌশলে এসব সিদ্ধান্ত বড় ভূমিকা রাখবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। কারণ বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।
সব মিলিয়ে পিএন চেয়ারম্যানের এই বক্তব্য মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে নতুন করে নেতৃত্ব, স্থিতিশীলতা এবং জবাবদিহিতার প্রশ্নকে সামনে এনেছে। এখন দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন কোন দিকে মোড় নেয়, তা সময়ই বলে দেবে।