প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশনে যোগ দিতে ঢাকা ছাড়ছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই সফরকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন, কূটনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দারুণ কৌতূহল তৈরি হয়েছে। রবিবার দিবাগত রাতে তিনি নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে যাত্রা করবেন একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে। সফরের অংশ হিসেবে তার সঙ্গে যাচ্ছেন দেশের চারজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, যা এই সফরের গুরুত্বকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ ও অবস্থান থেকে উঠে আসা এই নেতাদের একই সফরে দেখা যাচ্ছে, যা অনেকের মতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক রূপরেখার জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে।
সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধান উপদেষ্টা নিউ ইয়র্কে পৌঁছবেন ২২ সেপ্টেম্বর। তার পুরো সফরকালীন অবস্থান চলবে ২ অক্টোবর পর্যন্ত। এর মধ্যে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন ছাড়াও একাধিক উচ্চপর্যায়ের সভা, দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করবেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ২৬ সেপ্টেম্বরের অধিবেশন, যেখানে তিনি বাংলাদেশের পক্ষে মূল বক্তব্য প্রদান করবেন।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টা তার বক্তব্যে বিগত এক বছরে দেশের অভ্যন্তরে গৃহীত সংস্কার কার্যক্রমের বিস্তারিত তুলে ধরবেন। বিশেষ করে প্রশাসন, নির্বাচন ও বিচারব্যবস্থায় আনা পরিবর্তনগুলো বিশ্বসম্মুখে তুলে ধরে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে তিনি আগামীর নির্বাচনের মাধ্যমে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করবেন। এটি হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পুনর্জাগরণকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করার একটি সুযোগ।
এ বছরের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ আরেকটি কারণে। ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত হবে ‘হাই লেভেল কনফারেন্স অন দ্য সিচুয়েশন অব রোহিঙ্গা মুসলিমস অ্যান্ড আদার মাইনরিটিস ইন মায়ানমার’। সাধারণ পরিষদের সভাপতির সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সভাটি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে এমন উচ্চ পর্যায়ের বৈশ্বিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রধান উপদেষ্টা ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, রোহিঙ্গা ইস্যুকে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করবেন। এ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, কক্সবাজারে আশ্রিত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও সামাজিক কাঠামোর ওপর বিশাল চাপ তৈরি করেছে। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
জাতিসংঘের এবারের উচ্চ পর্যায়ের সভার আগে বাংলাদেশ গত মাসে কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক অংশীদার, মানবাধিকার সংস্থা এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি অংশীদার সভা আয়োজন করে। সেই সভায় রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসনের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধান উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেছেন যে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশন থেকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরিকল্পনা গৃহীত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের অন্যতম তাৎপর্য হচ্ছে চারজন ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী হওয়া। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বিরোধী দলগুলো রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা থাকলেও, এখন তাদের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ তৈরি হওয়া দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রক্রিয়াকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবে। এটি আন্তর্জাতিক মহলে একটি শক্ত বার্তা দেবে যে বাংলাদেশ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে কার্যকর অগ্রগতি করছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বাইরে প্রধান উপদেষ্টা একাধিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে। বৈঠকগুলোয় অর্থনৈতিক সংস্কার, বৈদেশিক বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে।
এই সফরকে কেন্দ্র করে নিউ ইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে। প্রবাসী সম্প্রদায় আশা করছে, প্রধান উপদেষ্টা তাদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করবেন এবং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ নির্বাচন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে সরাসরি বক্তব্য রাখবেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের এই সফর বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক তাৎপর্য বহন করছে। তিনি একদিকে যেমন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্বার্থ তুলে ধরবেন, অন্যদিকে রোহিঙ্গা সংকটের মতো বৈশ্বিক ইস্যুতে কার্যকর ভূমিকা রাখার চেষ্টা করবেন। পাশাপাশি তার সঙ্গে থাকা চার রাজনৈতিক নেতার উপস্থিতি বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেবে, বাংলাদেশ তার গণতান্ত্রিক পথচলায় নতুন অধ্যায় শুরু করেছে।
এই সফর নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এখন অপেক্ষা—প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য ও বৈঠকগুলো কতোটা কার্যকরভাবে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।