মানিকগঞ্জে বিএনপি-জামায়াতের দমন-পীড়ন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৪৮ বার
মানিকগঞ্জে বিএনপি-জামায়াতের দমন-পীড়ন

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে মানিকগঞ্জ জেলা দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর জন্য এটি ছিল শক্ত অবস্থান। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে এ জেলার রাজনৈতিক চিত্রে আমূল পরিবর্তন আসে। ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ আসার পর ধীরে ধীরে মানিকগঞ্জ হয়ে ওঠে তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের জায়গা। বিরোধী দলের ওপর নেমে আসে কঠোর দমননীতি, মামলা-হামলা, গ্রেপ্তার, এমনকি হত্যার মতো ভয়াবহ ঘটনা। প্রায় সাড়ে ১৬ বছরের শাসনকালে বিএনপি-জামায়াতের অন্তত নয়জন নেতাকর্মী প্রাণ হারান, আহত হন অগণিত মানুষ, আর গায়েবি মামলার জালে জড়িয়ে পড়েন প্রায় ১১ হাজার নেতাকর্মী।

মানিকগঞ্জে সংঘটিত রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিপীড়নের বিবরণ কেবল পরিসংখ্যান নয়, এগুলো হয়ে উঠেছে মানুষের জীবনের ট্র্যাজেডি, পরিবারগুলোকে ভেঙে চুরমার করার নির্মম কাহিনি।

২০১৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সিংগাইর উপজেলার গোবিন্দল নতুন বাজারে ঘটে যায় এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ। হেফাজত ইসলাম ও সমমনা দলের হরতালের সমর্থনে মিছিল বের হলে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গুলিতে প্রাণ হারান চারজন—নাজিম উদ্দিন মোল্লা, নাসির উদ্দিন, আলমগীর হোসেন ও শাহ আলম। আহত হন আরও অন্তত ৩৬ জন, যাদের অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। নিহত আলমগীর হোসেনের পরিবারের সদস্যরা এখনও এই রক্তাক্ত স্মৃতির যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন। চাচাতো ভাই আইনজীবী সোলাইমান কবির অভিযোগ করেন, বিনা উসকানিতে গুলি চালানো হলেও ভুক্তভোগীদের মামলা গ্রহণ করা হয়নি, বরং উল্টো তাদের ওপরই একাধিক মামলা চাপিয়ে দেওয়া হয়।

তিতাসে বিএনপির নতুন কমিটি গঠন, ওসমান সভাপতি সেলিম সম্পাদক

এরপর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান আরও পাঁচজন বিএনপি-যুবদল কর্মী। তাদের মধ্যে ছিলেন শিবালয়ের রফিকুল ইসলাম, সিংগাইরের সাদ মাহমুদ খান, হরিরামপুরের মহিউদ্দিন মোল্লা, সাটুরিয়ার আফিকুল ইসলাম সাদ এবং মানিকগঞ্জ সদরের শফিক উদ্দিন আহমেদ। নিহত রফিকুল ইসলামের বৃদ্ধ পিতা রহিজ উদ্দিন এখনো কষ্টে দিন কাটান। তিনি বলেন, “সন্তানের লাশ কাঁধে তোলা যে কেমন যন্ত্রণা, তা শুধু ভুক্তভোগীরাই বুঝতে পারে।”

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে মামলার ব্যবহার ছিল মানিকগঞ্জে নিয়মিত ঘটনা। তথ্য অনুসারে, আওয়ামী লীগ শাসনামলে মোট ২৫১টি গায়েবি মামলায় আসামি করা হয় প্রায় ১১ হাজার বিএনপি ও জামায়াত কর্মীকে। রাজনৈতিক মিটিং, মিছিল কিংবা হরতালে অংশ নিলেই মামলা, গ্রেপ্তার ও রিমান্ড ছিল দৈনন্দিন ঘটনা। বিএনপি নেতা মাসুদ পারভেজের কথায় বোঝা যায় এর ভয়াবহতা। তিনি একাই হয়েছেন ৪৬টি মামলার আসামি, ৩৫ বার কারাগারে গেছেন, একাধিকবার গুমের হুমকিও পেয়েছেন।

মানিকগঞ্জ পৌর বিএনপি নেতা মুরাদ হোসেন জানান, কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তার পরিবার বারবার হামলার শিকার হয়েছে। ঈদের আগের রাতে শ্রমিক লীগ নেতার নেতৃত্বে তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে বৃদ্ধ মা থেকে শুরু করে ছোট শিশুকেও রেহাই দেওয়া হয়নি।

মানিকগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসন দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, এ আসনগুলোতে ক্ষমতাসীন এমপি-মন্ত্রী ও তাদের পরিবার প্রভাব খাটিয়ে বালু-মাটি ব্যবসা, টেন্ডারবাজি, জমি দখল ও পরিবহন চাঁদাবাজি করে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

মানিকগঞ্জ-১ আসনে সাবেক ক্রিকেটার এ এম নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। মানিকগঞ্জ-২ আসনে জনপ্রিয় শিল্পী থেকে এমপি হওয়া মমতাজ বেগমকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে বালুমহাল দখল, চাঁদাবাজি ও সম্পদ বৃদ্ধির ঘটনায়। অন্যদিকে মানিকগঞ্জ-৩ আসনে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও তার পরিবার পুরো জেলার অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন বলে অভিযোগ উঠে।

জাহিদ মালেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে সরকারি জমি দখল, পরিবহন খাত থেকে চাঁদাবাজি এবং নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তার স্ত্রী শাবানা মালেক ও ছেলে রাহাত মালেক শুভ্রও সন্ত্রাসী বাহিনী পরিচালনা করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করেছেন।

গায়েবি মামলার কারণে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। আদালতে হাজিরা ও আইনজীবীর পেছনে তাদের সমস্ত সঞ্চয় ফুরিয়ে গেছে। বহু মানুষ গ্রামে রাতযাপন করতে সাহস পাননি, পরিবারগুলো পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। নির্বাচনের সময় বিরোধী দলের প্রার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলার কারণে সাধারণ মানুষ তাদের সঙ্গে প্রকাশ্যে দাঁড়াতেও ভয় পেয়েছেন।

মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আফরোজা খান রিতা অভিযোগ করেন, শুধু বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেই প্রায় ১৭২টি মামলা দেওয়া হয়েছে, যেখানে ১০ হাজার মানুষকে আসামি করা হয়েছে। তার মতে, আওয়ামী লীগ এভাবে বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে।

একইভাবে জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা কামরুল ইসলাম জানান, তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৭৯টি মামলা করা হয়েছে, যার ফলে হাজারের বেশি কর্মী ভুক্তভোগী হয়েছেন। তার নিজের বিরুদ্ধেও ২১টি মামলা হয়েছিল।

অন্যদিকে নাগরিক সংগঠন সুজনের স্থানীয় প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস বলেন, “ক্ষমতায় থেকে একটি গোষ্ঠী পুরো জেলাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। বালুমহাল, পরিবহন খাত থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জমি দখল পর্যন্ত সব জায়গায় তাদের হাত ছিল। এসবের বিরুদ্ধে এখনই আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।”

মানিকগঞ্জের এই দীর্ঘ দমন-পীড়নের চিত্র কেবল একটি জেলার গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতিচ্ছবি। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, হামলা, হত্যা—এসব ঘটনা গণতন্ত্রের বিকাশের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ যখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, তখন ভুক্তভোগীরা আশা করছেন ন্যায়বিচার, প্রতিকার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত