প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত দল জামায়াতে ইসলামী আবারো জনসমক্ষে তাদের অবস্থান তুলে ধরেছে। শুক্রবার রাজধানীর কদমতলীর তালিমুল কুরআন ইসলামিয়া মাদ্রাসায় ফ্রি ফ্রাইডে ক্লিনিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর আব্দুস সবুর ফকির স্পষ্ট ভাষায় জানান, তাদের দল ক্ষমতার রাজনীতি করে না, বরং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও মানবতার সেবাকে কেন্দ্র করেই তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। তিনি বলেন, সমাজের প্রতিটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া জন্মগত অধিকার এবং মৌলিক অধিকার, আর সেই অধিকার বাস্তবায়নে জামায়াতে ইসলামী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আব্দুস সবুর ফকির বলেন, ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ ছাড়া মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আল্লাহ মানুষকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য। কিন্তু আল্লাহর আইনের পরিবর্তে মানুষের তৈরি মতবাদে রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়ার কারণে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও জাতি বৈষম্যমুক্ত হতে পারেনি। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিটি স্তরে স্তরে বৈষম্য গড়ে উঠেছে, যার কারণে একশ্রেণীর মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমাচ্ছে আর সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চিকিৎসকের দেখা পাচ্ছে না।
তার মতে, মানুষের তৈরি আইন ও মতবাদে এই বৈষম্যের জন্ম হয়েছে। কারণ যারা আইন প্রণয়ন করেন তারা এবং তাদের রাজনৈতিক গোষ্ঠী সেই আইনের সুবিধা ভোগ করেন, অথচ সাধারণ মানুষ শোষণের শিকার হন। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এই বৈষম্যের কোনো স্থান নেই। তিনি দাবি করেন, সেখানে রাষ্ট্রপ্রধান যে সুবিধা ভোগ করবেন, একজন সাধারণ নাগরিকও সমানভাবে সেই সুবিধা পাবেন। কোনো দলমত, ধর্ম-বর্ণ বা জাতিগত বৈষম্য ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নেই। সকল নাগরিক সমান মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা এবং অধিকার ভোগ করবেন।
আব্দুস সবুর ফকির দেশের মানুষকে ইসলামী সমাজ গঠনের ডাক দিয়ে বলেন, আগামী নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, ক্ষমতায় যাওয়া বা না যাওয়া তাদের মূল লক্ষ্য নয়; মানুষের সেবা ও অধিকার প্রতিষ্ঠাই জামায়াতের নীতি। অতীতে সমাজসেবামূলক কাজ করলেও তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী তকমা দিয়ে নেতাকর্মীদের আটক করা হয়েছে। তবুও জনগণ সাক্ষী যে, জামায়াতে ইসলামী মানবতার সেবা বন্ধ করেনি।
অনুষ্ঠানটিতে সভাপতিত্ব করেন তালিমুল কুরআন ইসলামিয়া মাদ্রাসার চেয়ারম্যান শাহজাহান খান। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা ঈসমাইল খানের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী আব্দুল জাব্বার, নারায়ণগঞ্জ জেলা শুরা ও কর্মপরিষদ সদস্য মজিবুর রহমান মিয়াজী এবং ৬৫ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী আব্দুল আলিম। অনুষ্ঠানে ফ্রি চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করে কেয়ার ডি-ল্যাব এন্ড কনসালটেশন সেন্টার। উদ্বোধনী দিনে প্রায় ৫ শতাধিক মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেন।
আব্দুস সবুর ফকির তার বক্তব্যে বারবার ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার গুরুত্বের কথা বলেন। তিনি মনে করেন, দেশের অভ্যন্তরে চলমান বৈষম্য, দারিদ্র্য এবং ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চনার মূল কারণ হলো আল্লাহর বিধান পরিত্যাগ করে মানুষের তৈরি মতবাদে রাষ্ট্র পরিচালনা। তার মতে, ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কেবল একটি রাজনৈতিক কাঠামো নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক চুক্তি, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক সমানভাবে মর্যাদা, অধিকার এবং সুযোগ পাবে।
এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতে ইসলামীর এই নতুন বার্তা মূলত জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা। দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে সীমিত কার্যক্রমের মধ্যে থাকলেও দলটি সামাজিক কর্মকাণ্ড ও মানবিক সহায়তাকে সামনে রেখে নতুনভাবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে চাইছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, জামায়াতে ইসলামী একদিকে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে সক্রিয় রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে। এই দ্বৈত অবস্থান ভবিষ্যতে তাদের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত জনতা ও সেবাগ্রহীতাদের প্রতিক্রিয়ায় বোঝা যায়, সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে সরাসরি সেবামূলক কার্যক্রমে আস্থা রাখছে। বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা পেয়ে তারা সন্তুষ্টি প্রকাশ করে এবং অনেকেই আশা করেন, সমাজে এই ধরণের সেবার বিস্তার ঘটলে সাধারণ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে।
জামায়াতের নেতাদের মতে, তাদের দল যেভাবে মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে, তাতে রাজনৈতিক বাধা-বিপত্তি তাদের থামাতে পারবে না। বরং মানুষের সেবা করার মধ্য দিয়েই তারা জনগণের আস্থা অর্জন করতে চায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের বক্তব্য নতুন নয়। তবে আব্দুস সবুর ফকিরের সাম্প্রতিক আহ্বানটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, জামায়াতে ইসলামী ভবিষ্যতের রাজনীতিতে নিজেকে “অধিকার প্রতিষ্ঠা ও মানবতার সেবার” শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে যাওয়ার পরও বৈষম্য ও মৌলিক অধিকার নিয়ে যে প্রশ্নগুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে, সেগুলোকেই এখন রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে দলটি।