প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে যখন নানা জল্পনা-কল্পনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহেরের বক্তব্য নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন—প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া যদি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে তা শুধুমাত্র অনিশ্চয়তা ও বিভাজন আরও বাড়াবে, সমাধান নয়।
মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডা. তাহের বলেন, “ফেব্রুয়ারিতে একটি নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে, কিন্তু সেই নির্বাচন হতে হবে অংশগ্রহণমূলক ও সংস্কারভিত্তিক। কেবল একটি নির্বাচনের আয়োজন করলেই গণতন্ত্রের সংকট কাটবে না। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন তার প্রমাণ—নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু সংকট থেকে মুক্তি মিলেনি, বরং সমস্যা আরও জটিল হয়েছে।”
তার মতে, বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা। তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি চাই যেখানে জনগণই হবে ক্ষমতার উৎস, আর নির্বাচন হবে সেই জনগণের মতামতের প্রতিফলন। এর বাইরে যেকোনো প্রক্রিয়া শুধু সংকটকেই গভীর করবে।”
ডা. তাহেরের বক্তব্যে স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে, দেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাঠামো ও সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে তার উদ্বেগ। তিনি বলেন, “বাস্তবায়নে দেরি করা হচ্ছে এইভাবে, সেইভাবে—যদি ষড়যন্ত্র চলে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া নির্বাচন দেওয়া হয়, তাহলে সবকিছুই প্রশ্নবোধক হয়ে যাবে।”
তিনি আরও বলেন, “এখন সময় খুব সীমিত। ফেব্রুয়ারির আগে স্বল্প সময়ের মধ্যেই যেসব সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, সেগুলোকে আইনি ভিত্তি দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। তার পরেই নির্বাচন দিতে হবে। অন্যথায় এ নির্বাচনও মানুষের আস্থার বাইরে চলে যাবে।”
তিনি সরকারের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “যারা এই সংস্কার বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছেন বা সরকারের পক্ষ থেকে যে অবরুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে, তাতে যদি নির্বাচন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তার দায়ভার তাদেরই নিতে হবে। জাতির কাছে জবাবদিহি করতে হবে তাদের।”
ডা. তাহেরের এই বক্তব্য এসেছে এমন এক সময়, যখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে থাকা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং সেখানে বিভিন্ন বৈঠককে ঘিরেও চলছে তীব্র আলোচনা।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে যোগ দিতে ড. ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যান। তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাসনিম জারা প্রতিনিধি দলে ছিলেন।
সূত্র জানায়, ওই সফরে তাঁরা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, নির্বাচন ও সংস্কার বিষয়ে আলোচনা করেন। সফর শেষে দলের অন্য সদস্যরা দেশে ফিরলেও ড. ইউনূস চিকিৎসার প্রয়োজনে শিকাগোতে অবস্থান করছেন।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন ডা. তাহের। গত এপ্রিলে যুক্তরাজ্যে কিডনির চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরেন তিনি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগেও তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। অসুস্থতা সত্ত্বেও দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর সরব অবস্থান ও সুস্পষ্ট বক্তব্য দলীয় মহলে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডা. তাহেরের এই মন্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। একদিকে এটি সরকারের প্রতি সতর্ক সংকেত, অন্যদিকে বিরোধী জোটের মধ্যেও একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গঠনের ইঙ্গিত। তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে, জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়াকে এখনই পরীক্ষার পর্যায়ে দেখছে।
ডা. তাহেরের বক্তব্য অনুযায়ী, যদি এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন না হয়—বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করা হয়—তাহলে যে কোনো নির্বাচনই জনআস্থার সংকটে পড়বে।
তিনি বলেন, “গণতন্ত্রের মূল হলো আস্থা ও অংশগ্রহণ। জনগণের আস্থা ছাড়া নির্বাচন শুধু আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়। আমরা এমন একটি নির্বাচন চাই যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষ বিশ্বাস করবে—তার ভোটের মূল্য আছে।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন ও ২০১৮ সালের ভোটের অনিয়মের ইতিহাস এখনও মানুষের স্মৃতিতে তাজা। ২০২৪ সালের নির্বাচনে যদিও কিছু নতুন দল অংশ নেয়, তবু সেটি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তাই ডা. তাহেরের বক্তব্য জনগণের অনুভূতির সঙ্গে মিলে গেছে।
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ এখন এমন এক সঙ্কটময় মুহূর্তে আছে, যেখানে একটি ভুল পদক্ষেপ গোটা গণতান্ত্রিক যাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারে। আমরা চাই, সবাই মিলেই একটি গ্রহণযোগ্য, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথ তৈরি করুক।”
এ সময় তিনি জাতীয় ঐক্যের ওপরও জোর দেন। “রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে,” বলেন ডা. তাহের।
তার বক্তব্যে একদিকে যেমন সরকারের প্রতি সংস্কার বাস্তবায়নের আহ্বান ছিল, তেমনি বিরোধী শক্তিগুলোর প্রতি আহ্বান ছিল সংযম ও দায়িত্বশীলতার। তিনি বলেন, “রাজনীতি যদি প্রতিশোধের জায়গা থেকে না এসে দায়িত্বের জায়গায় দাঁড়ায়, তাহলে জনগণই এর প্রকৃত সুফল পাবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, ডা. তাহেরের এই বক্তব্য শুধুমাত্র জামায়াতের অবস্থান নয়, বরং সমগ্র বিরোধী রাজনৈতিক জোটের একটি অভিন্ন বার্তা বহন করছে—সংস্কার ছাড়া নির্বাচন অর্থহীন, আর অর্থহীন নির্বাচনের ফল হবে আরও গভীর রাজনৈতিক অচলাবস্থা।
দেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও এই সংকেত উপেক্ষা করতে পারবে না। কারণ, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে যে উচ্চাশা তৈরি হয়েছে, সেটির সাফল্য নির্ভর করছে এসব সংস্কারের বাস্তবায়নের ওপর।
শেষ পর্যন্ত ডা. তাহেরের বক্তব্যে যে মূল বার্তা প্রতিধ্বনিত হয়েছে তা হলো— গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার কেবল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নয়, বরং সুষ্ঠু সংস্কার ও জনগণের আস্থার ওপর নির্ভর করে। প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া কোনো নির্বাচনই হবে না বিশ্বাসযোগ্য, বরং তা দেশকে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দেবে।










