বিসিবির নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক: ‘নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালকগণ দিবা স্বপ্ন দেখছেন’ — ইশরাক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৮ বার

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর থেকেই নানা বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে দেশের ক্রীড়া অঙ্গনে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে আলোচিত প্রতিক্রিয়াটি এসেছে বিএনপি নেতা ও তরুণ রাজনীতিক ইশরাক হোসেনের কাছ থেকে। সোমবার (৬ অক্টোবর) মধ্যরাতে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বিসিবির নির্বাচিত পরিচালকগণের বৈধতা ও তাদের পরিকল্পনা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন, এবং এটিকে ‘সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ও দিবাস্বপ্ন’ বলে আখ্যায়িত করেন।

ইশরাকের মতে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ কোনওভাবেই গণতান্ত্রিক বা স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়নি। তাঁর ভাষায়, “বিসিবির নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালকগণ দিবা স্বপ্ন দেখছেন। যেখানে কোনও নির্বাচনই হয়নি, যাদের কোনো বৈধতা নেই, তাদের স্বল্পমেয়াদী কিংবা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক।”

এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি শুধু বোর্ডের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাই নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দিকেও ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর দাবি, এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকৃত ক্রীড়া সংগঠক ও ক্লাব প্রতিনিধিদের মতামতকে উপেক্ষা করা হয়েছে, এবং শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে।

ইশরাক তার ফেসবুক পোস্টে আরও লেখেন, “আওয়ামী দোষর বসুন্ধরা, গাজী গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপসহ সব গণহত্যাকারী আওয়ামী সরকারের সহযোগীদের বিরুদ্ধে আগে ব্যবস্থা নিতে হবে। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে যখন খুনি হাসিনা গণতন্ত্রকামী জনগণের ওপর স্টিম রোলার চালিয়েছে, তখন এই গ্রুপ ও তাদের লোকগুলো ক্রিকেটকে ব্যবহার করে জনগণের টাকায় নাচ, গান, ফুর্তি করেছে। ভারতের দালালি করেছে এবং তাদের অশ্লীল সংস্কৃতি মিডিয়াতে প্রচার করেছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “যারা আজকে এদেরকে বসিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরপর স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিসিবি নির্বাচন করা হবে—এটাই ক্লাব ও জেলা ক্রীড়া সংগঠকদের দাবি।”

তার এই বক্তব্যের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে তাঁর বক্তব্যকে অনেকেই সমর্থন করে বলছেন, বিসিবির প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করছে কিছু ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী, যা বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নষ্ট করছে। অন্যদিকে, সরকারপন্থী একটি অংশ তাঁর এই মন্তব্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে।

বিসিবির এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গত সোমবার রাজধানীর একটি অভিজাত পাঁচ তারকা হোটেলে। এই নির্বাচনে মোট ২৫ জন পরিচালক নির্বাচিত হন। নতুন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল, যিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেট প্রশাসনে যুক্ত ছিলেন এবং ক্রিকেটের উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে তাঁর সভাপতিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ইশরাক হোসেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই নিয়োগও সরকারের ইচ্ছানুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে, যা ক্রিকেটের স্বাধীন বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইশরাকের এই বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রীড়া প্রশাসনের অস্বচ্ছতা ও রাজনৈতিকীকরণের বিরুদ্ধে একটি কঠোর প্রতিক্রিয়া। অনেকেই মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে বিসিবি নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করছে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী, যারা ক্রীড়ার বদলে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এর ফলে দেশের ক্রিকেটে প্রকৃত সংগঠক ও খেলোয়াড়দের ভূমিকা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

অন্যদিকে, বিসিবির পক্ষ থেকে এখনো ইশরাক হোসেনের মন্তব্যের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। বোর্ডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিসিবির নির্বাচন সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক ও সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়ায় হয়েছে। যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তারা সকলেই ক্লাব প্রতিনিধি ও ক্রীড়া সংগঠনের মনোনীত প্রার্থী। কারও নিয়োগ এখানে নেই।”

তিনি আরও বলেন, “রাজনীতিবিদদের উচিত নয় ক্রীড়া প্রশাসনের বিষয়ে বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করা। ক্রিকেটের উন্নয়নে যেকোনো গঠনমূলক পরামর্শ আমরা গ্রহণ করতে রাজি, কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সমালোচনা দেশের খেলাধুলার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।”

এদিকে, বিসিবির অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, নতুন বোর্ডের অগ্রাধিকার থাকবে ঘরোয়া ক্রিকেট সংস্কার, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নারী ও পুরুষ দলকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা। তবে সমালোচকরা মনে করেন, যদি নির্বাচন প্রক্রিয়াই স্বচ্ছ না হয়, তবে যেকোনো পরিকল্পনাই হবে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের ক্রীড়া প্রশাসন এখন এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মুখে—একদিকে পেশাদার ক্রিকেটের বিস্তার ও বাণিজ্যিক উন্নয়ন, অন্যদিকে রাজনৈতিক আনুগত্যের চাপে স্বাধীন নীতিমালা প্রণয়ন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ক্রিকেট, যা একসময় জাতির ঐক্যের প্রতীক ছিল, এখন অনেক ক্ষেত্রে হয়ে উঠছে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের আরেকটি ক্ষেত্র।

বিসিবির নির্বাচনের এই বিতর্ক তাই শুধু ক্রীড়াঙ্গনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এটি দেশের গণতান্ত্রিক চর্চা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার বড় একটি প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। ইশরাক হোসেনের বক্তব্য হয়তো রাজনৈতিক রঙে রঞ্জিত, কিন্তু তাঁর প্রশ্নগুলো— নির্বাচন কতটা মুক্ত ও স্বচ্ছ ছিল, এবং কারা প্রকৃতপক্ষে ক্রিকেট পরিচালনা করছেন— তা এখন ক্রীড়া মহলের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ড বহু বছর ধরেই রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক অস্বচ্ছতার অভিযোগে সমালোচিত। যদিও দেশের ক্রিকেটাররা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ধারাবাহিকভাবে সাফল্য দেখাচ্ছেন, তবুও প্রশাসনিক জটিলতা ও দলীয়করণের কারণে ক্রিকেট কাঠামোতে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ক্রিকেট উন্নয়নের পথে এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, বিসিবির নির্বাচনকে ঘিরে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা এখন আর কেবল ক্রিকেট বোর্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি, দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে নতুন করে আলো ফেলেছে। এখন দেখার বিষয়, বিসিবি এই সমালোচনার মুখে নিজেকে কতটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে— নাকি এটি আরও একবার রাজনৈতিক প্রভাবের বলি হয়ে পড়বে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত