সিলেট-৬ আসনে মনোনয়ন নিয়ে বিএনপির দৌড়ঝাঁপ, একক প্রার্থী জামায়াতে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫২ বার
সিলেট-৬ আসনে মনোনয়ন নিয়ে বিএনপির দৌড়ঝাঁপ, একক প্রার্থী জামায়াতে

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫।  একটি বাংলাদেশ ডেস্ক,  একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিলেট অঞ্চলের রাজনীতিতে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এখন সবচেয়ে আলোচিত আসনগুলোর একটি হচ্ছে সিলেট-৬। গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনটি ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিক প্রভাবশালী এবং সচরাচর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। বহু বছর ধরে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি বলে বিবেচিত হলেও এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। দলীয় কার্যক্রম স্থগিত থাকায় আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। ফলে দীর্ঘদিন পর এই আসনে এক নতুন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার দ্বার খুলেছে—যেখানে একদিকে রয়েছে প্রার্থী জটের ভেতরে পড়ে যাওয়া বিএনপি, অন্যদিকে একক প্রার্থী নিয়ে মাঠে নেমেছে জামায়াতে ইসলামী।

কুশিয়ারা নদীর পাড়ঘেঁষা গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার অঞ্চল অতীতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির পালাবদলের সাক্ষী থেকেছে। এই আসনে আওয়ামী লীগ ছয়বার, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি দুটি করে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী দুটি নির্বাচনে জয় পেয়েছেন। রাজনৈতিকভাবে এ আসনটি বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এখানকার জনগোষ্ঠী রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সক্রিয়। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি যেন বিএনপির জন্য সুবর্ণ সুযোগ হয়ে এসেছে, কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি এত সহজ নয়।

দলের অভ্যন্তরে এখন মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের অন্তত নয়জন প্রার্থী নিজেকে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে প্রমাণে মাঠে তৎপর। ফলে একদিকে যেখানে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে চলছে দৌড়ঝাঁপ, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে বিভাজন ও গোষ্ঠীগত কোন্দলও মাথাচাড়া দিচ্ছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে বিএনপির কৌশলগত অবস্থান ও প্রার্থী নির্বাচনের সিদ্ধান্ত যে আসনের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন ফয়সল আহমদ চৌধুরী। রাতের ভোটখ্যাত ওই নির্বাচনে তিনি সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের বিরুদ্ধে এক লাখেরও বেশি ভোট পেয়েছিলেন। যদিও জয় পাননি, তবুও তিনি এলাকায় সক্রিয় ছিলেন। সাম্প্রতিক আন্দোলন, বিশেষত জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। স্থানীয় পর্যায়ে তাঁকে ‘সংগ্রামী নেতা’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

তার পাশাপাশি বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে মাঠে আছেন দলটির কেন্দ্রীয় সদস্য আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. এনামুল হক চৌধুরী, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। প্রত্যেকে নিজস্ব অনুসারী নিয়ে এলাকায় সক্রিয় রয়েছেন এবং জনসংযোগ বাড়াতে উঠেপড়ে লেগেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এবার যে কোনো মূল্যে সংসদে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চায়। তবে প্রার্থীর সংখ্যা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে দলের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন। মনোনয়ন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার পর যারা বাদ পড়বেন, তাঁদের প্রতিক্রিয়া ও অবস্থানও নির্বাচনী মাঠে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য বিএনপির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতাও এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের ফরেন অ্যাফেয়ার্স উপদেষ্টা অহিদ আহমদ, প্রয়াত নেতা কমর উদ্দিনের মেয়ে সাবিনা খান এবং সাবেক সংসদ সদস্য ড. সৈয়দ মকবুল হোসেন লেচু মিয়ার কন্যা সৈয়দা আদিবা হোসেন। বিদেশে বসবাস করলেও স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে তাঁদের পারিবারিক সম্পর্ক গভীর। তারা এখন এলাকাবাসীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি করতে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন।

এছাড়াও জেলা বিএনপির সহশিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক তামিম ইয়াহইয়া এবং বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাসের আহ্বায়ক হিসেবে পরিচিত চিত্রনায়ক হেলাল খানও মনোনয়নের আশায় কাজ করে যাচ্ছেন। স্থানীয় নেতাদের মতে, এদের প্রত্যেকেই প্রভাবশালী, তবে তাঁদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবই বিএনপির বড় দুর্বলতা হতে পারে।

এর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী একক প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠে নেমেছে। এবার দলটি প্রার্থী করেছে ঢাকা মহানগর উত্তরের আমীর মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিনকে। তিনি আগে ছাত্র শিবিরের সভাপতি ছিলেন এবং দলে দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে তিনি ইতোমধ্যে নিয়মিত গণসংযোগ ও মতবিনিময় সভা শুরু করেছেন। গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজারের বিভিন্ন মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করছেন। জামায়াতের স্থানীয় নেতারা বলছেন, নতুন এই প্রার্থী তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারছেন এবং তাঁর ‘পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি’ দলীয় ইমেজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

জামায়াতের প্রার্থী পরিবর্তনের সিদ্ধান্তও কৌশলগত। পূর্ববর্তী নির্বাচনে এই আসন থেকে প্রার্থী ছিলেন জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান, যাকে এবার সরিয়ে সিলেট-১ আসনে পাঠানো হয়েছে। দলটির লক্ষ্য, নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে আসনে একটি নতুন ভোটব্যাংক তৈরি করা।

অন্যদিকে ইসলামী ঐক্যজোট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত মজলিস এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মতো দলগুলোর প্রার্থীরাও আসনটিতে মাঠে রয়েছেন। যদিও তাদের প্রভাব সীমিত, তবে ভোটের মাঠে এসব দলগুলোর অংশগ্রহণ মূলত বিএনপির ভোট ভাগ করে নিতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি আসনটিতে এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে। বিএনপি যদি প্রার্থী জট কাটিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করতে পারে, তবে তারা বিজয়ের কাছাকাছি যেতে পারে। কিন্তু একাধিক শক্তিশালী মনোনয়নপ্রত্যাশী এবং দলীয় বিভাজন যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে জামায়াতের একক প্রার্থী সেই সুযোগটাই কাজে লাগাতে পারে।

স্থানীয় ভোটারদের মতে, এবারের নির্বাচনে প্রার্থীর চেহারা নয়, বরং সংগঠনের ঐক্য এবং নেতৃত্বের যোগ্যতাই বিজয় নির্ধারণ করবে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট যদি মনোনয়ন ও প্রচার কৌশলে ভুল করে, তবে দীর্ঘদিন পরও জামায়াত এই আসনে চমক দেখাতে পারে—যা হবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত।

সিলেট-৬ আসনের রাজনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে ব্যক্তিগত অবস্থান ও জনপ্রিয়তা বড় হয়ে উঠেছে। আগামী নির্বাচন শুধু এ আসনের ভবিষ্যৎ নয়, সিলেট অঞ্চলে বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কের নতুন অধ্যায়েরও সূচনা করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত