প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশজুড়ে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীরা আজ সোমবার থেকে শুরু করেছেন লাগাতার কর্মবিরতি। ২০ শতাংশ বাড়ি ভাতা বৃদ্ধি, ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা এবং দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনার প্রতিবাদেই এই কর্মবিরতি শুরু হয়েছে। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয় ও কলেজে পাঠদান কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমে প্রবেশ করলেও শিক্ষকরা পাঠদান থেকে বিরত রয়েছেন।
রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সকাল থেকেই অচলাবস্থার চিত্র দেখা গেছে। শিক্ষকরা যথাসময়ে স্কুল ও কলেজে উপস্থিত হলেও, কোনো ক্লাস না নিয়ে কর্মবিরতিতে অংশ নেন। পাঠদানের পরিবর্তে তারা আলোচনা ও সংহতি কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানের সামনে দেখা গেছে শিক্ষকদের ব্যানার হাতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে।
অন্যদিকে, আন্দোলনরত শিক্ষক-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান নিয়েছেন। রোববার থেকেই তারা সেখানে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন এবং ঘোষণা দিয়েছেন—প্রজ্ঞাপন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। সকাল গড়াতেই শহীদ মিনারে জড়ো হতে থাকেন শত শত শিক্ষক। দুপুর নাগাদ স্থানটি রূপ নেয় এক মানবিক প্রতিবাদের মঞ্চে। অনেকে হাতে ব্যানার, কারো গলায় স্লোগান—“প্রজ্ঞাপন চাই, ন্যায্য দাবি চাই”—এই দাবির ধ্বনি মুখর করে তোলে গোটা এলাকা।
জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজীজি শহীদ মিনারে উপস্থিত শিক্ষক-কর্মচারীদের উদ্দেশে বলেন, “আমাদের আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, এটি ন্যায্য দাবির আন্দোলন। আমরা রাস্তায় নামিনি আনন্দের জন্য, আমাদের সহকর্মীদের ওপর যেভাবে হামলা হয়েছে, তা শুধু অমানবিক নয়, ঘৃণিতও। শিক্ষক সমাজ দেশের বিবেক। আমাদের ওপর হামলা মানে সেই বিবেকের ওপর আঘাত।” তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “প্রজ্ঞাপন না হওয়া পর্যন্ত আমরা কোনো ক্লাসে যাব না। এই আন্দোলন চলবে যতক্ষণ না পর্যন্ত আমাদের দাবি পূরণ হয়।”
তিনি আরো জানান, রবিবার প্রেসক্লাবের সামনে শিক্ষক সমাবেশে পুলিশের লাঠিচার্জ ও জলকামান ব্যবহারের ঘটনায় অন্তত পাঁচজন শিক্ষক আহত হয়েছেন। এর প্রতিবাদে কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হয়। “আমাদের পাঁচ সহযোদ্ধাকে আহত করা হয়েছে, কিন্তু আমরা ভয় পাইনি। আমরা ন্যায়বিচার ও সম্মানের জন্য মাঠে নেমেছি, এবং আমাদের দাবি না মানা পর্যন্ত কেউ ফিরে যাবে না,” বলেন আজীজি।
শিক্ষক নেতারা বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের ক্ষতির কথা ভেবে বারবার আলোচনার পথে গিয়েছি। কিন্তু দুই মাস পার হয়ে গেলেও প্রতিশ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। এখন আমাদের আর পিছু হটার উপায় নেই।”
গত আগস্টে জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত শিক্ষক সমাবেশে শিক্ষা উপদেষ্টা এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ২০ শতাংশ বাড়ি ভাতা, ১,৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা এবং উৎসব ভাতা বৃদ্ধির আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় শিক্ষক সমাজে ক্ষোভ বাড়ছে। আন্দোলনরত শিক্ষকরা বলছেন, সরকারি শিক্ষকরা যখন নিয়মিতভাবে এসব সুবিধা পান, তখন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা কেন বঞ্চিত হবেন?
রাজধানীর মিরপুরের একটি কলেজের শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, “আমরা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার কাজে নিয়োজিত। অথচ আমাদের ন্যায্য প্রাপ্য নিয়ে বারবার রাস্তায় নামতে হয়। এটি আমাদের জন্য অপমানজনক। আমরা কোনো বাড়তি কিছু চাই না—শুধু প্রাপ্যটাই চাই।”
শিক্ষকদের কর্মবিরতির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উদ্বেগ বাড়ছে। অভিভাবকরা বলছেন, চলমান একাডেমিক ক্যালেন্ডারে এটি বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে পিছিয়ে পড়বে। তবে শিক্ষকরা বলছেন, এটি তাদের একমাত্র উপায়।
অন্যদিকে, আন্দোলনরতদের দাবির প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও নড়েচড়ে বসেছে। মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র জানিয়েছে, গত ৫ অক্টোবর শিক্ষা উপদেষ্টা এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ভাতা ২০ শতাংশ এবং চিকিৎসা ভাতা ১,০০০ টাকা নির্ধারণে নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ে। উৎসব ভাতা ৭৫ শতাংশ করারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না আসায় প্রজ্ঞাপন জারি করা সম্ভব হয়নি।
শিক্ষক নেতারা এ বিষয়ে বলেন, “আমরা আলোচনার পথে ছিলাম। কিন্তু প্রশাসনের উদাসীনতায় আজ আমরা রাস্তায়। কোনো শিক্ষক ক্লাস বন্ধ রাখতে চান না, কিন্তু আমাদের জীবনযাত্রা এতটাই কষ্টকর হয়ে উঠেছে যে ন্যায্য পাওনা আদায় ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।”
শিক্ষকদের কর্মবিরতি আজ শুধু আন্দোলন নয়, এটি শিক্ষকদের মর্যাদা ও জীবনের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যখন শহীদ মিনারের পলাশপাতার নিচে তারা স্লোগান দিচ্ছেন, তখন সেটি কেবল একটি পেশাগত দাবি নয়—এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ন্যায্যতার আহ্বানও বটে।
রোববারের ঘটনাপ্রবাহ এখনো রাজধানীর রাস্তায় স্পষ্ট—প্রেসক্লাবের সামনে সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দ, জলকামানের ফোয়ারা, এবং আহত শিক্ষকদের রক্তমাখা পোশাক যেন স্মরণ করিয়ে দেয়, শিক্ষক সমাজ এখন আর নিঃশব্দ নয়। তারা এখন দাবি জানাতে জানে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জানে।
সারা দেশে এখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিস্তব্ধ। ছাত্রছাত্রীরা মাঠে খেলছে, ক্লাসরুম ফাঁকা, আর শিক্ষকরা শহীদ মিনারে বসে আছেন এক অদম্য প্রত্যয়ের সঙ্গে—যতক্ষণ না তাদের দাবির ন্যায্য সমাধান আসে।
এই আন্দোলন কতদিন চলবে, তা কেউ জানে না। কিন্তু স্পষ্টতই বলা যায়, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কণ্ঠে এখন যে প্রতিবাদের সুর উঠেছে, সেটি আর থেমে থাকবে না যতক্ষণ না ন্যায্যতার প্রজ্ঞাপন কাগজে লেখা হয়।