প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ও জটিল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলো আজ নতুন মোড় নিয়েছে। বুধবার সকাল থেকেই ঢাকার পুরানাপল্টনে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুই কক্ষ—ট্রাইব্যুনাল-১ ও ট্রাইব্যুনাল-২—ছিল কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা। সকাল ১০টা থেকে একে একে হাজির করা হয় মোট ৪৫ জন উচ্চপ্রোফাইল আসামিকে, যাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি, শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীসহ সাবেক ১০ মন্ত্রী, কয়েকজন সচিব এবং সাবেক সাংসদ।
আদালত কক্ষের পরিবেশ ছিল থমথমে। দীর্ঘ সময় ধরে মিডিয়া কর্মী, আইনজীবী, মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের ভিড়ে আদালত প্রাঙ্গণ যেন এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে ওঠে। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত এসব প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিত্বকে দেখতে মানুষের আগ্রহ ছিল স্পষ্ট। কেউ কেউ বলছিলেন, “এটাই হয়তো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।”
আজকের শুনানিতে ট্রাইব্যুনাল-১ এ ছিল বিশেষ গুরুত্ব। এখানেই শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তৃতীয় দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন হওয়ার কথা। চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম আদালতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দালিলিক প্রমাণ ও সাক্ষ্য তুলে ধরবেন বলে জানা গেছে। বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল সকাল থেকে শুনানি শুরু করেন।
প্রসিকিউশন জানায়, তাদের কাছে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য ও প্রমাণ রয়েছে যা প্রমাণ করে যে, ওই সময় গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে নিরীহ সাধারণ নাগরিকদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন, গুম, হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে বলা হয়, অভিযুক্তরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এসব অপরাধে ভূমিকা রেখেছেন। প্রসিকিউশন তাদের বিরুদ্ধে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উপস্থাপন করেছে—যার মধ্যে রয়েছে হত্যাযজ্ঞ, গণগ্রেফতার, নির্যাতন, গণমাধ্যম দমন এবং রাজনৈতিক নিপীড়ন।
অপরদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এই মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দেশে নতুন ক্ষমতার কাঠামো গঠনের পর প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যেই এসব মামলা দায়ের করা হয়েছে।” আদালতে তারা যুক্তি দেন, “কোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত নয়, বরং তা সময়ের রাজনৈতিক প্রতিশোধেরই বহিঃপ্রকাশ।”
আজকের কার্যক্রমে মূলত দুইটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—একদিকে শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে চলমান মামলার যুক্তিতর্ক, অন্যদিকে আনিসুল হক, পলক, দীপু মনি, সালমান এফ রহমান, তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীসহ ৪৫ জনের হাজিরা ও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল। জানা গেছে, এসব মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন নির্ধারিত থাকলেও প্রসিকিউশন সময় চেয়ে আবেদন করতে পারে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্তদের বেশিরভাগই জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে সংঘটিত ঘটনাগুলোর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে তদন্ত সংস্থা দাবি করছে। বিশেষ করে, ২৭ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময়কে ‘সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়’ হিসেবে উল্লেখ করেছে তদন্ত দল। তারা বলছে, “সেই সময়ে প্রশাসনের শীর্ষপর্যায়ের নির্দেশে নিরাপত্তা বাহিনী এবং দলীয় কর্মীরা মিলে যেভাবে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালিয়েছে, তা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।”
ট্রাইব্যুনাল-২ এও আজ রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি শুনানি। আশুলিয়ায় গণঅভ্যুত্থানের সময় কয়েকজন প্রতিবাদী তরুণকে হত্যা করে তাদের মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। আদালত প্রাঙ্গণে একাধিক সাক্ষী উপস্থিত রয়েছেন, যাদের মধ্যে দুইজন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বলে জানা গেছে। প্রসিকিউশন বলছে, এই মামলার মাধ্যমে গণহত্যার শৃঙ্খলিত প্রমাণ উপস্থাপিত হবে।
এদিকে, আদালত প্রাঙ্গণের বাইরে ছিল কঠোর নিরাপত্তা। র্যাব, পুলিশ ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের বিপুল সদস্য মোতায়েন ছিল। ট্রাইব্যুনালের চারপাশে স্থাপন করা হয় একাধিক চেকপোস্ট। প্রবেশপথে তল্লাশি ছাড়াই কেউ প্রবেশ করতে পারেননি। সাংবাদিকদেরও অনুমতি পেতে হয়েছে বিশেষ পাসের মাধ্যমে।
একজন প্রসিকিউটর বলেন, “আমরা একটি কঠিন কিন্তু ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করছি। এই মামলা শুধু কয়েকজন ব্যক্তির নয়, এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবতা এবং ন্যায়বিচারের লড়াইয়ের প্রতীক।”
অন্যদিকে আসামিদের আত্মীয়-স্বজন ও সমর্থকরা আদালত চত্বরে মানববন্ধন করে দাবি জানান, “এই মামলাগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল, এর সঙ্গে বাস্তব ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মামলাগুলোর রায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, যদি প্রমাণিত হয় যে সত্যিই ওই সময় সংঘটিত হয়েছিল, তবে এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আইনি ও নৈতিক পুনর্মূল্যায়নের ঘটনা।
দিনশেষে আদালত স্থগিত ঘোষণা করলে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণ ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে থাকে। তবে আজকের এই হাজিরা ও শুনানি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে—কেউ বলছেন ন্যায়বিচারের সূচনা, কেউ আবার বলছেন রাজনৈতিক প্রতিশোধের নতুন অধ্যায়।
যেভাবেই দেখা হোক, আজকের এই দিনটি বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ৪৫ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির একসঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হিসেবে হাজিরা দেওয়া দেশের আইনি কাঠামো এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক গভীর ও প্রতীকী বার্তা বহন করে—যে বার্তা হয়তো আগামী দিনের বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।