প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা যখন চরমে, ঠিক তখনই ভোটের আগে মেসে মেসে বিরিয়ানি বিতরণের ঘটনা নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বুধবার রাত আটটা থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত রাজশাহীর কাজলা এলাকায় অবস্থিত একাধিক ছাত্র মেসে বিরিয়ানির প্যাকেট বিলি করেছেন স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা—এমন অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে। প্রত্যেক প্যাকেটের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল ছাত্রদল মনোনীত প্যানেলের প্রার্থীদের ছবি ও ব্যালট নম্বর সম্বলিত টোকেন, যা অনেকের কাছে স্পষ্ট রাজনৈতিক প্রচারণা হিসেবেই প্রতীয়মান হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ঘটনাটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। একাধিক মেসের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, কাজলা এলাকার “জমজম মেস”সহ আশপাশের আরও কয়েকটি মেসে রাতের খাবারের আয়োজনের কথা আগে থেকেই জানানো হয়েছিল। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রদল সংশ্লিষ্ট কিছু যুবক দরজায় দরজায় গিয়ে খাবারের প্যাকেট পৌঁছে দেয়। অনেক মেসেই ছাত্ররা নিজেরা খাবার না বানিয়ে অপেক্ষা করছিল এই ‘বিশেষ ডিনারের’ জন্য।
প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী, যিনি পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেন, “সকালের দিকেই মেসে খবর আসে, রাতে স্থানীয় ছাত্রদলের পক্ষ থেকে ‘রাবিয়ানদের’ জন্য খাবারের আয়োজন করা হবে। আমরা ভেবেছিলাম হয়তো সাধারণ কোনো আয়োজন, কিন্তু রাতে দেখা গেল, খাবারের প্যাকেটের সঙ্গে প্রার্থীদের ছবি ও ভোটের নম্বর লেখা টোকেনও দেওয়া হচ্ছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “এটা আসলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা বলেই মনে হয়েছে।”
অন্যদিকে, কাজলার জমজম মেসের একাধিক শিক্ষার্থী দাবি করেছেন, তাদের মেসের মালিক স্থানীয় বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তারই তত্ত্বাবধানে মেসে ওই খাবার বিতরণের আয়োজন করা হয়। কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, “রাত সাড়ে দশটার দিকে কিছু যুবক এসে বলে, সবাই যেন রুমে থাকে, খাবার পৌঁছে দেওয়া হবে। তারা নিজেরাই হাতে হাতে বিরিয়ানি দেয়। পরে শুনলাম, এরা বিএনপি-ছাত্রদলের কর্মী।”
এ বিষয়ে জানতে জমজম মেসের ম্যানেজার পলাশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ফোন ধরেন অন্য একজন। তিনি প্রথমে কিছু বলতে চাননি, পরে সংক্ষেপে বলেন, “বাবা, এসব ছবি বা ভিডিও দিও না, পরে ঝামেলা হয়।” তার কণ্ঠে শোনা যাচ্ছিল আতঙ্কের সুর, যা আরও জোরালো করেছে পুরো ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী মনে করছেন, এটি ভোটের আগে শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করার একটি “নরম প্রচারণা”। নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের খাবার, উপহার বা যেকোনো সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে ভোটে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা স্পষ্টভাবে অনৈতিক। শিক্ষার্থীরা বলেন, “রাকসু নির্বাচনের মূল সৌন্দর্য হলো গণতান্ত্রিক চর্চা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের পরিবেশ। কিন্তু যদি এমনভাবে দলীয় প্রভাব খাটানো হয়, তাহলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”
স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদল নেতারা অবশ্য বিষয়টিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। একজন স্থানীয় ছাত্রদল ওয়ার্ড সভাপতি বলেন, “আমরা তো দোয়া চাইতে খাবার দিয়েছি। কেউ ক্ষতি করিনি। এটা তো তেমন কোনো অপরাধ নয়।” তবে তিনি স্বীকার করেন যে, তাদের পক্ষ থেকেই কাজলার কিছু মেসে খাবার পাঠানো হয়েছিল।
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কেউ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে শিক্ষক সমাজের অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, “রাকসু নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতীক। এখানে যদি বাহিরের রাজনৈতিক প্রভাব পড়ে, তাহলে তা শিক্ষার্থীদের চিন্তা ও নেতৃত্ব বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।” তিনি মনে করেন, “যে কোনো প্রকার প্রভাব বা প্রলোভন দিয়ে নির্বাচনী পরিবেশকে বিকৃত করা শিক্ষার আদর্শের পরিপন্থী।”
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের এক নেতা বিষয়টিকে “চিন্তিত করার মতো ঘটনা” বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা চাই রাকসু নির্বাচন হোক সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও মুক্ত পরিবেশে। কেউ যদি খাবার বা টোকেন দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, তাহলে সেটা নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি চরম অসম্মান।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দীর্ঘ ৩৪ বছর পর। সর্বশেষ ১৯৮৮ সালে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তাই এবারকার নির্বাচনকে ঘিরে শিক্ষার্থী ও প্রাক্তন ছাত্রদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির প্রতিটি অঙ্গন এখন সরব, প্রার্থীরা প্রচারণায় ব্যস্ত, ক্যাম্পাসে চলছে পোস্টার ও ব্যানার ঝুলানোর প্রতিযোগিতা। এর মাঝেই বিরিয়ানি বিতরণের এই অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে নির্বাচনের সততা ও প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেনি, তবে ক্যাম্পাসজুড়ে বিষয়টি নিয়ে নীরব উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা অপেক্ষা করছেন, নির্বাচন কমিশন বা প্রশাসন এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়।
রাজশাহীর এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু জ্ঞানের চর্চার জায়গা নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রও হয়ে উঠেছে ধীরে ধীরে। প্রশ্ন উঠেছে—যেখানে তরুণদের বিবেক গঠনের কথা, সেখানে যদি শুরুতেই রাজনৈতিক স্বার্থের বিনিময়ে প্রলোভনের সংস্কৃতি ঢুকে পড়ে, তবে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব কেমন হবে?