সীমিত আকারে খুলছে সেন্টমার্টিন, জাহাজ চলবে না আপাতত

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬১ বার
সীমিত আকারে খুলছে সেন্টমার্টিন, জাহাজ চলবে না আপাতত

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ আট মাসের প্রতীক্ষার পর আজ শনিবার (১ নভেম্বর) অবশেষে খুলছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের দুয়ার। তবে স্বস্তির এই খবরের মাঝেই দেখা দিয়েছে নতুন শঙ্কা—কারণ, পর্যটকবাহী জাহাজ চালানো আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জাহাজ মালিকরা। ফলে সীমিত আকারে খোলা দ্বীপটিতে পর্যটকদের যাওয়া এখনো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

সেন্টমার্টিনকে ঘিরে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের একটি বড় অংশ নির্ভরশীল। প্রতি বছর শীত মৌসুমে হাজার হাজার পর্যটক দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেখানে ছুটে যান। কিন্তু গত বছরের ডিসেম্বর থেকে পরিবেশগত ঝুঁকি, অতিরিক্ত পর্যটক চাপ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের হুমকির কারণে প্রশাসন দ্বীপটিতে পর্যটক প্রবেশ সীমিত করে দেয়। টানা আট মাস বন্ধ থাকার পর সরকারের কঠোর ১২ দফা নির্দেশনা মেনে এবার শর্তসাপেক্ষে খোলা হচ্ছে দ্বীপটি।

সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নভেম্বরে সেন্টমার্টিনে পর্যটকরা শুধু দিনের বেলায় ভ্রমণ করতে পারবেন, রাত কাটানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক সেখানে প্রবেশের অনুমতি পাবেন। একইসঙ্গে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নতুন করে বেশ কিছু কড়া বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে।

বঙ্গোপসাগরের এই ছোট প্রবাল দ্বীপটি বাংলাদেশের গর্ব হলেও গত কয়েক বছরে সেখানে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের কারণে মারাত্মক পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে। প্লাস্টিক বর্জ্য, শব্দদূষণ, অবাধ মোটরচালিত যান চলাচল, এবং সৈকতে রাতের বেলা আলোকসজ্জা বা বারবিকিউ পার্টির কারণে দ্বীপটির প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছিল। তাই এ বছর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) যৌথভাবে দ্বীপে প্রবেশের নতুন নিয়ম তৈরি করেছে।

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো নৌযান বিআইডব্লিউটিএ এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া সেন্টমার্টিনে যেতে পারবে না। সব পর্যটককে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের অনুমোদিত অনলাইন পোর্টাল থেকে টিকিট সংগ্রহ করতে হবে। টিকিটে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড থাকবে, যা স্ক্যানের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। নকল টিকিট বা কোডবিহীন টিকিট সঙ্গে থাকলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে।

নভেম্বর মাসে দিনভিত্তিক ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হলেও ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে সীমিত আকারে রাত্রিযাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে সম্পূর্ণভাবে পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে, যাতে দ্বীপের জীববৈচিত্র্য কিছুটা সময় পায় পুনরুদ্ধারের। পাশাপাশি সৈকতে কোনো মোটরসাইকেল, সি-বাইক বা মোটরচালিত যান চলাচল করা যাবে না। নিষিদ্ধ করা হয়েছে প্লাস্টিক ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিং, পলিথিন, স্ট্র, চামচ, প্লাস্টিক বোতলসহ পরিবেশবিধ্বংসী উপকরণ বহন।

পর্যটকদের নিজস্ব পানির ফ্লাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ‘নিজ দায়িত্বে ময়লা ফেলে আসার’ নির্দেশনা কার্যকর করা হয়েছে। এছাড়া কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা বিক্রয়, সামুদ্রিক কাছিম, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, পাখি ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

তবে সরকারি এই কঠোর বিধিনিষেধের কারণে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে পর্যটক-খরার। সেন্টমার্টিনগামী জাহাজগুলোর মালিক সংগঠন “সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ” জানিয়েছে, তারা আপাতত জাহাজ চালু করবে না। সংগঠনের এক মুখপাত্র জানান, “সরকারি নির্দেশনা মেনে জাহাজ চালালে প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক যাতায়াত করতে পারবেন। এতে জাহাজ মালিকদের ব্যবসায়িক ক্ষতি হবে, কারণ ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে না। তাই আপাতত জাহাজ চালানো স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটনকেন্দ্রিক মানুষজন। দীর্ঘ আট মাস বন্ধ থাকার পর দোকানপাট, হোটেল, গেস্টহাউস ও রেস্টুরেন্টগুলো নতুন করে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কেউ সংস্কার কাজ শেষ করেছেন, কেউ নতুন বিনিয়োগও করেছেন। কিন্তু জাহাজ না চালালে পর্যটক আসবে কীভাবে, সেই প্রশ্নে তারা এখন দিশেহারা।

সেন্টমার্টিনের স্থানীয় বাসিন্দা মো. আজিজুল হক বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম এবার কিছুটা ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াবে। দোকানে পণ্য তুলেছি, কটেজগুলো প্রস্তুত করেছি। কিন্তু যদি জাহাজ না চলে, তাহলে কেউ আসবে না। আবার আমাদের ক্ষতি হবে।”

টেকনাফ থেকে জাহাজে সেন্টমার্টিন যাত্রা করাই মূল পথ। প্রতি শীত মৌসুমে সেখানে অন্তত তিনটি বড় যাত্রীবাহী জাহাজ প্রতিদিন ভ্রমণ করত। কিন্তু এবার জাহাজ না চললে বিকল্প হিসেবে থাকবে মাত্র কয়েকটি ছোট ট্রলার বা স্পিডবোট, যা ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়সাপেক্ষ। ফলে পর্যটক সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার পরিবেশ রক্ষার কথা ভেবে ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় কিছু নমনীয়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে পর্যটক সংখ্যা সীমিত করলেও যাতায়াতের সুব্যবস্থা না থাকলে এই সিদ্ধান্ত পর্যটন খাতকে আরও সংকটে ফেলবে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা চাই সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ টিকিয়ে রেখে পর্যটন চালু থাকুক। এজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। ব্যবসায়িক স্বার্থের আগে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।”

অন্যদিকে পরিবেশবিদরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, দ্বীপটি ইতিমধ্যেই সংকটাপন্ন। প্রবালের বৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে, কাছিমের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে, এবং সমুদ্র দূষণ ক্রমেই বেড়েছে। তাই অন্তত কয়েক মাসের জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ দরকার ছিল।

পরিবেশ কর্মী সাবরিনা রহমান বলেন, “সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। এটি হারিয়ে গেলে আমরা শুধু একটি পর্যটন স্থান নয়, একটি জীববৈচিত্র্যের অমূল্য সম্পদ হারাব। তাই সরকার যদি সত্যিই নিয়মগুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করে, তা হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বড় অর্জন।”

সব মিলিয়ে, দীর্ঘ বিরতির পর আজ যখন দ্বীপটির দ্বার খুলছে, তখন আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে অনিশ্চয়তাও। পরিবেশ রক্ষা ও পর্যটন—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জাহাজ না চললে পর্যটন সীমিতই থাকবে, কিন্তু হয়তো পরিবেশ কিছুটা শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পাবে।

বাংলাদেশের পর্যটন খাতের টেকসই উন্নয়ন এখন নির্ভর করছে সেন্টমার্টিনে সরকারের এই নতুন নীতির সফল বাস্তবায়নের ওপর। দেখা যাক, দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ এবার সত্যিই ভারসাম্যের পথে ফিরে যেতে পারে কিনা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com