সরকারি অর্থ আত্মসাৎ মামলায় কৃষি কর্মকর্তা শরীফুলের কারাবাস

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪২ বার
সরকারি অর্থ আত্মসাৎ মামলায় কৃষি কর্মকর্তা শরীফুলের কারাবাস

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর বুধবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দায়ের করা দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক সহকারী পরিচালক (অর্থ) সৈয়দ শরীফুল ইসলামকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। সরকারি তহবিল থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে, আর সেই তদন্তের স্বার্থেই তাকে কারাগারে আটক রাখার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার আদালতে হাজির হওয়ার পর জামিন আবেদন নামঞ্জুর হওয়ায় তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, মাঠপর্যায়ের কৃষি অফিস ও আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক চাহিদাপত্র ছাড়াই সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়; অথচ সেই প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণ মিলেছে। ২০১৬–১৭ এবং ২০১৭–১৮ অর্থবছরে প্রায় ৫ কোটি ৩২ লাখ টাকার বিশেষ বরাদ্দের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। সরকারি অর্থ বিতরণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধি-বিধান থাকলেও তা অমান্য করে, প্রক্রিয়াগত নিয়ম লঙ্ঘন করে এবং সরকারি রেকর্ডপত্রে কারসাজির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।

দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আসামি শরীফুল ইসলাম ইচ্ছাকৃতভাবে সরকারি রাজস্ব খাতে ক্ষতি সাধন করেছেন। তিনি শুধু অর্থ আত্মসাৎই করেননি, বরং সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র নষ্ট ও ভুয়া নথি তৈরি করে সরকারি সম্পদ আত্মসাতের জালিয়াতি কার্যক্রমকে আড়াল করারও চেষ্টা করেছেন। দুদকের উপ-পরিচালক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. হাফিজুল ইসলাম আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, “মামলার স্বার্থে আসামিকে কারাগারে রাখা জরুরি। মুক্ত অবস্থায় থাকলে তদন্ত প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে এবং প্রমাণ বিনষ্টের আশঙ্কা রয়েছে।”

সেগুনবাগিচা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করার সময় দুদকের কর্মকর্তারা জানান, অভিযুক্ত কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক অনিয়মে জড়িত ছিলেন এবং অভিযোগের আলোকে তদন্ত এগোতে থাকায় নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে আটক করা হয়। জনস্বার্থে ও তদন্তের স্বচ্ছতার স্বার্থে এ অভিযান পরিচালিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন দুদকের জনসংযোগ বিভাগের উপ-পরিচালক মো. আকতার হোসেন।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করলেও প্রশাসনের একাংশে দীর্ঘদিন ধরেই কিছু অসাধু কর্মকর্তা দুর্নীতিতে লিপ্ত থেকে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করছেন—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কৃষি খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি; অথচ এই খাতের উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে আত্মসাৎ চেষ্টার ঘটনা দেশবাসীকে গভীরভাবে হতাশ করেছে। বিশেষ করে যখন দেশের কৃষকের স্বার্থে সরকার বিভিন্ন সময় বিশেষ বরাদ্দ ঘোষণা করে থাকে, তখন সেই বরাদ্দ জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগ শুধু প্রশাসনের নয়, বরং সমাজ ও অর্থনীতির জন্যও এক গভীর আঘাত হয়ে দাঁড়ায়।

এ মামলায় শরীফুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু আর্থিক জালিয়াতির নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে সরকারি প্রকল্পের বরাদ্দের অপব্যবহার এবং কৃষি খাতের উন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করার মতো গুরুতর অপরাধ। প্রসঙ্গত, সরকারি বরাদ্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিটি পদের সুনির্দিষ্ট অনুমোদন প্রক্রিয়া রয়েছে। মাঠ পর্যায় থেকে প্রকল্প চাহিদা, তা পর্যালোচনা, অনুমোদন, বরাদ্দ এবং বাস্তবায়ন—প্রতিটি ধাপে থাকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। অথচ এই মামলার প্রাথমিক তথ্য বলছে, চাহিদাপত্র ছাড়াই কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়, এবং সেই অর্থ সরকারি কাজে ব্যয় না হয়ে আত্মসাৎ করা হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ ধরনের অনিয়মের ফলে মাঠপর্যায়ের কৃষি উন্নয়ন কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়ে। কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার ব্যাহত হলে কৃষি উৎপাদনেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। এই ঘটনায় বিভাগের অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, যারা মনে করছেন দুর্নীতির দায়ে জড়িতদের উদাহরণমূলক শাস্তি হলে প্রশাসনে সততা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সহজ হবে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সরকারি অর্থ আত্মসাতের সকল ক্ষেত্রে কেবল আর্থিক জরিমানা ও শাস্তি নয়, বরং আইন অনুযায়ী অনিয়মে জড়িত ব্যক্তি চাকরিচ্যুতির মুখোমুখি হতে পারেন। মামলার তদন্ত শেষ হলে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে এবং বিচারের মুখোমুখি হবেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা। দুদকের আইনজীবীরা আশা করছেন, অভিযোগের ভিত্তি ও প্রমাণাদির ওপর দাঁড়িয়ে আদালত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন।

বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশনের সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং শিক্ষা-বাণিজ্য খাতেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতির মামলায় দ্রুত তদন্ত ও বিচারের কার্যক্রম এগোলে অন্যরা সতর্ক হবে, যার ফলে ধীরে ধীরে প্রশাসনে দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ তৈরি হতে পারে। তবে আদালত ও দুদকের যৌথ উদ্যোগে এসব মামলার কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হওয়া জরুরি বলে মনে করেন অনেকে।

মানুষের প্রত্যাশা স্পষ্ট—সরকারি অর্থ আত্মসাতের মতো অপরাধে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত হবে এবং ন্যায়বিচারের মাধ্যমে সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাবে। কৃষি কর্মকর্তা শরীফুল ইসলামের বিরুদ্ধে চলমান মামলাটি সেই প্রত্যাশা পূরণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে বলে আশা করা যায়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সক্রিয়তা, দুদকের অনুসন্ধানী ভূমিকা এবং আদালতের স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত—সব মিলেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করছে। আগামী দিনের পথচলায় এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপই হতে পারে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার মূল চালিকা শক্তি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত