প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
চলতি সময়ের একাধিক বিষয় ও আন্দোলনের মাঝেই তিস্তা নদী-সংক্রান্ত দাবি এক বিশেষ উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। শুক্রবার সকালে রাজধানীর সংসদ ভবনের সামনের সড়ক মানিক মিয়া এভিনিউয়ে আয়োজিত এক মানববন্ধনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, “কাগজে কলমে নয়, তিস্তা বাস্তবায়ন করতে হবে দৃশ্যমান।” তিনি দাবি করেন, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় ও তিস্তা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন শুধু দাবি নয়—“তিন কোটি মানুষের প্রাণের দাবি” ও অধিকার।
মানববন্ধনে উল্লেখ করেন, চুক্তি মেনে নদীর পানির সঠিক বণ্টন না হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দুলু বলেন, “তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, এটি দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি ও পরিবেশের প্রাণ। ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার, বাঁধ নির্মাণ ও নদী খাত ভরাটের কারণে তিস্তা আজ বিলুপ্তির পথে।” এই তীরবর্তী এলাকায় হাজার বছরের ধরে ফসল হয়েছিল, গৃহহীন হয়ে গেছেন বহু মানুষ—তবু প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি বলে তিনি নিন্দা করেন।
দুলু আরও বলেন, “আমরা আমাদের এই অধিকার নিয়ে ঘরে ফিরতে চাই।” মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা লালমনিরহাট জেলা সমিতি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ সমিতি ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ছিলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক দলমত নির্বিশেষে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তিস্তা রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, “এই আন্দোলন সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, শান্তিপূর্ণ ও জনস্বার্থনির্ভর।”
বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের আলোচনায় প্রায় দশ-পনেরো বছর ধরে তিস্তা নদীর পানি চুক্তি, বাঁধ নির্মাণ এবং মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে দাবি তুলেছে উত্তরাঞ্চলের মানুষ। দুলু এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো মনে করছে, এই প্রকল্প ভারতের ও বাংলাদেশের সমঝোতায় সময়সাপেক্ষ হলেও বাস্তবায়ন না হলে উত্তরাঞ্চলিয়া কৃষক ও সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
তিস্তা-মেগা প্রকল্পকে ব্যখ্যা করে দুলু বলেন, “নদীর সংরক্ষণ ও শক্তিশালী প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু ফসল ও কৃষিকে নয়, পাইপলাইন, সেচ, বিদ্যুৎ ও পরিবেশ‐সহ সবক্ষেত্রে উত্তরাঞ্চলকে এগিয়ে নিতে হবে।” তিনি যে পরিমাণ তাগিদ নিয়ে দাবি তুলছেন, সেটি শুধু প্রশাসনিক কথাবার্তার মাধ্যমেই সিমাবদ্ধ নয়; মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
দুর্ভিক্ষপীড়িত এমন এক অঞ্চলে, যেখানে একদিকে বন্যা আর অন্যদিকে পানির অভাবে খরার অভিজ্ঞতা রয়েছে, তিস্তার গত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে সমতলে। দুলু বলেন, “বর্ষায় নদীগর্ভে ভেসে যায় কৃষকের স্বপ্ন, খরা মৌসুমে পানির অভাবে ফসল হয় না।” এইসব দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি তিস্তা-মেগা প্রকল্পকে “উত্তরাঞ্চলের অংশুম্ভব উন্নয়নের চাবিকাঠি” হিসেবে বিবেচনা করছেন।
মানববন্ধনে তিনি স্লোগান দিয়েছেন—“তিস্তা বাঁচাও, জীবন বাঁচাও”। তিনি প্রশাসনকে পরামর্শ দিয়েছেন দ্রুত সরকারি পর্যালোচনােলে যেতে এবং ভারত ও বাংলাদেশের সম্মিলিত নদী রক্ষা কমিশনের বৈঠকে তিস্তার ন্যায্য অংশ না পেলে আন্তর্জাতিক আইনের দ্বারস্থ হওয়ার বিষয়টি ভাবা উচিত।
এই দাবি ও আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী রক্ষার দাবিয়ে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়—এটি ভৌগোলিক ও মানবাধিকার বিষয়। উত্তরাঞ্চলের ক্ষেত্রেই তিস্তার বাস্তবায়ন বিলম্ব দামের দাবি না, বরং সময় সাপেক্ষ বাধ্যবাধকতা হয়ে উঠেছে। নদী খনন, পানি নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, ধ্বংসপ্রবণ নদী তীরবর্তী উন্নয়ন—এসব কার্যক্রম দ্রুত গতিতে নেওয়ার পরামর্শ দেন তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুলুর এমন বয়ান আগামী নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ তিস্তা বিষয়টি এখন শুধু উন্নয়ন বা প্রকল্পের বিষয় না—এটি ভোট ও অর্থনীতির সঙ্গে জুড়ে গেছে। নির্বাচনী окруলে এ দাবিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কৌশলও তৈরি হচ্ছে।
যদিও সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বহুবার তিস্তা সংগঠনগুলোর দাবি বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেছে, বাস্তবে প্রকল্প শুরু বা সাফল্য মেলেনি। দুলুর ভাষায়, “কাগজে চুক্তি হয়েছে, কিন্তু নদী এখনো বসেছে অপেক্ষায়।” তাই কালো ও লাল টেপযুক্ত রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বাস্তব পদক্ষেপ আজ সময়ের দাবি—তিস্তার মতো নদীর ভাগ্য নির্ধারণ করছে এক বৃহত্তর চ্যালেঞ্জ।
উত্তরাঞ্চলের কৃষক, মাছচাষি ও নদীপথে জীবিকার মানুষ আজ দিন গুণছেন। তাদের আশা একটাই—বন্যা থেমে যাক, খরা কাটিয়ে তুলুক জীবনে স্বাভাবিকতা। তিস্তা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে আসুক, প্রকল্পের বাস্তবতা মানুষের হাতে পৌঁছাক—এমনটাই দাবি করেছেন তারা। দুলু এবং আন্দোলনকারীরা বলছেন, এখনই সময়—কাগজে নয়, নদীর মাটিতে পরিবর্তন দেখতে।
এভাবেই তিস্তা নদীর ন্যায্য হিস্যা ও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিকে এক নতুন জীবন্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক মঞ্চে রূপ দেওয়া হয়েছে। সময়ই দেখাবে—এই মানববন্ধন, এই দাবিপ্রকাশ কোথায় যায়, উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশার আলোকে তাদের সামনে নতুন পথ খুলবে কি না।