ফলের বাজারে অস্থিরতা, রমজানে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৮৪ বার
ফলের বাজারে অস্থিরতা, রমজানে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর ফলের বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার মুখে উদ্বেগের ছাপ এখন স্পষ্ট। প্রতিদিন স্বাস্থ্যকর খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত এমন ফল যেমন আপেল, কমলা, আনারস, আঙুর ও মাল্টার দাম সম্প্রতি তুঙ্গে। সরজমিনে কারওয়ানবাজার ও সদরঘাটের পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা যায়, বিক্রেতারা নানা জাতের দেশি-বিদেশি ফল সাজিয়ে রেখেছেন, কিন্তু দাম বাড়ার কারণে ক্রেতারা প্রবেশ করতে দ্বিধা বোধ করছেন। ক্রেতাদের মধ্যে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষজনও আপেল বা কমলা কিনতে সমস্যায় পড়ছেন।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতি মূল্যমানের প্রভাব এবং আমদানি ও শুল্ক বৃদ্ধির সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। আমদানিকারকরা জানাচ্ছেন, উচ্চ শুল্কের কারণে বাজারে চড়া দাম হয়ে গেছে। আপেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩০০–৪০০ টাকা, কমলা ৩৪০–৩৬০ টাকা, মাল্টা ২৮০ টাকা, আনার ৫০০–৬০০ টাকা এবং আঙুর ৪০০–৫৫০ টাকায়। ক্রেতাদের কাছে এসব দাম এখন দৈনন্দিন ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এক বা দুই পিস ফল কিনলেও নিম্নআয়ের মানুষ প্রায় একেবারেই কিনতে পারছেন না। বাজারের এই চড়া দাম ক্রেতাদের মধ্যে হতাশা ও অসন্তুষ্টি সৃষ্টি করেছে, এবং বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, রমজান মাসের আগেই যদি পরিস্থিতি এমন থাকে, তবে রমজানকালে দাম আরও বৃদ্ধি পাবে।

ফল আমদানিকারক মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, “রমজানের সময় খুব কাছাকাছি চলে এসেছে, তাই পর্যাপ্ত পরিমাণে আমদানি না করলে বাজারে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। বর্তমানে আমদানিকৃত ফলের ওপর শুল্ক অনেক বেশি, যার কারণে সাধারণ মানুষ ক্রয় ক্ষমতার বাইরে পড়ছেন।” তার কথায়, বাজারে চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্য থাকলে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

একই সঙ্গে খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, “অন্যান্য বছর যে দামে পাইকারি থেকে কেনা যেত, এবার সেই দামে ফল পাওয়া যাচ্ছে না। দাম বেশি হওয়ায় অনেক ক্রেতা এক বা দুই পিস ফল কিনলেও, বড় পরিমাণে ক্রয় করছে না।” এতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, বাজারে চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, দেশের বাজারে আমদানি করা ফলগুলোর ওপর অযৌক্তিক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর, নাশপাতি ও আনারকে বিলাসী পণ্যের তালিকায় রাখার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য করে তোলা উচিত। অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, “নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক থাকলেও এসব ফলকে বিলাসী হিসেবে দেখা অযৌক্তিক। দেশের উৎপাদিত ও আমদানি করা ফলের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকা উচিত, যাতে ক্রেতারা বাজারে বৈষম্যের শিকার না হন এবং ফল কেনার ক্ষেত্রে চাপ অনুভব না করেন।”

দেশে বাণিজ্যিক পর্যায়ে ফল উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও বিশেষজ্ঞরা গুরুত্বারোপ করেছেন। তারা মনে করছেন, আমদানি নির্ভরতা কমাতে স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন। কৃষকদের সঠিক পরামর্শ, আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত বীজ সরবরাহ করলে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং ফলের দাম স্থিতিশীল থাকবে। এভাবে চড়া দাম থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

বাজারের অস্থিরতার সঙ্গে রমজানের সময় ক্রেতার চাপ আরও বাড়তে পারে। আচার্য্যদের মতে, এই সময় ফলের চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি হয়। বিশেষ করে মুসলমান সমাজে ইফতার ও সেহরিতে বিভিন্ন ফলের ব্যবহার অপরিহার্য। তাই রমজানের আগে উৎপাদন ও আমদানির সঠিক পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি।

বর্তমান পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায়, সরকারের নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপও জরুরি। শুল্ক হার পুনর্বিবেচনা, বাজার নজরদারি বৃদ্ধি এবং কৃষি উৎপাদন উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার কথা মাথায় রেখে নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার।

তাছাড়া ক্রেতা সচেতনতার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে চড়া দামে কিছু ফল কিনতে না পারলেও স্থানীয় মৌসুমী ফলের প্রতি মনোযোগ বাড়ানো উচিত। দেশের জলবায়ু ও মৌসুমের সাথে খাপ খাইয়ে ফলের ব্যবহার স্বাস্থ্যসম্মত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে যুক্তিসঙ্গত।

সংক্ষেপে, বর্তমানে ফলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যার মূল কারণ উচ্চ শুল্ক, আমদানিতে খরচ বৃদ্ধি এবং চাহিদা যোগানের ভারসাম্যহীনতা। রমজান মাসে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে, যদি পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না নেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, আমদানিকৃত ফলকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব। নীতিনির্ধারণী ও কৃষি সম্প্রসারণমূলক উদ্যোগ নেওয়া হলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জন্য বাজার আরও স্থিতিশীল ও সুবিধাজনক হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত