কপ-৩০ সম্মেলনে ৮০ দেশ জীবাশ্ম জ্বালানি কমাতে একমত

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬৬ বার
কপ-৩০ সম্মেলনে ৮০ দেশ জীবাশ্ম জ্বালানি কমাতে একমত

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি কমাতে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশ একমত হয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানোর একটি বৈশ্বিক রোডম্যাপ তৈরিতে। ব্রাজিলে আয়োজিত জাতিসংঘের কপ-৩০ জলবায়ু সম্মেলনে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো একযোগে এই আহ্বান জানায়। তবে তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক কয়েকটি দেশ এখনও এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দেখিয়েছে।

কপ-৩০ সম্মেলনের আয়োজক শহর বেলেমে দীর্ঘ আলোচনার পর এই উদ্যোগকে বাস্তবায়নের রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের জলবায়ু দূত টিনা স্টেগে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “এটা শুধু একটি পরিকল্পনা নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দায়িত্ব। আসুন আমরা একসঙ্গে কাজ করি এবং জীবাশ্ম জ্বালানি রোডম্যাপের ধারণাকে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নিই।”

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু আন্দোলনকারীরাও এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনালের ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জ্যাসপার ইনভেন্টর বলেন, “এ সিদ্ধান্ত কপ-৩০-এর একটি টার্নিং পয়েন্ট। উত্তর ও দক্ষিণের দেশগুলো যেখানে একসাথে জীবাশ্ম জ্বালানি ধাপে ধাপে কমানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে, তা বিশ্ববাসীর জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী বার্তা দেয়।” তিনি আরো যোগ করেন, “বেলেমের রাস্তায় চলমান ৪০ হাজার মানুষের প্রতিবাদ এবং বিশ্বের লাখ লাখ মানুষের আহ্বানকে সম্মেলনের আলোচনায় প্রতিফলিত করতে হবে। এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।”

জীবাশ্ম জ্বালানি কমানোর বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে ২০২৩ সালের কপ-২৮ সম্মেলনে দুবাইয়ে। ওই সম্মেলনে বিশ্বকে জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত করার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। তবে সৌদি আরবের নেতৃত্বে কিছু দেশ সেই প্রস্তাব বাতিলের চেষ্টা চালায়। ফলস্বরূপ, গত বছরের বাকুতে অনুষ্ঠিত আলোচনায় তা কার্যকরভাবে এগোয়নি। ব্রাজিলে কপ-৩০ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচিতে প্রাথমিকভাবে ‘জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসা’ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এমনকি সভাপতির পরামর্শ তালিকাতেও এটি রাখা হয়নি। আলোচ্যসূচিতে বর্তমানে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—অর্থায়ন, বাণিজ্য, স্বচ্ছতা এবং দেশগুলোর নির্গমন হ্রাস পরিকল্পনা (Nationally Determined Contributions-এনডিসি)। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে রাখতে এই চারটি বিষয় যথেষ্ট নয়।

ব্রিটেনের জ্বালানি সচিব এড মিলিব্যান্ড বলেন, “এটি একটি বৈশ্বিক জোট। উত্তর ও দক্ষিণের দেশগুলো একত্র হয়ে বিশ্বকে বার্তা দিচ্ছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন একটি এড়িয়ে যাওয়া যায় এমন বিষয় নয়। জীবাশ্ম জ্বালানি কমানোর বিষয়টি সম্মেলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা উচিত।”

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের রাস্তায় প্রতিরোধশীল শক্তিগুলো এখনও কার্যকর হতে পারে। তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দেরি করতে পারে। তবু কপ-৩০ সম্মেলনের এই একমত প্রদর্শন একটি নতুন আশা তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে দেশগুলো একটি নির্ধারিত রোডম্যাপের অধীনে জীবাশ্ম জ্বালানি কমানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। এতে শুধু পরিবেশ সংরক্ষণ হবে না, বরং নতুন প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বিনিয়োগও বৃদ্ধি পাবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি চরম বন্যা, খরা, অগ্ন্যুৎপাত ও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো না হলে এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। কপ-৩০ সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি কমানোর বিষয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমে বিশ্বের দেশগুলো একসঙ্গে ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুত হবে।

বিশ্বের বেশ কিছু দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নে বাধা হিসেবে দাঁড়াতে পারে। তবে সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপে দেশের অর্থনীতি, বায়ু দূষণ হ্রাস, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক উন্নয়ন সহ বহু ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য শক্তির খাত, যেমন সৌর, বায়ু ও হাইড্রো শক্তি, এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

তিন দিনের কপ-৩০ সম্মেলনে দেশের নেতারা স্বীকার করেছেন যে, জীবাশ্ম জ্বালানি কমানো শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি মানবতার জন্য এক নৈতিক দায়িত্ব। এই সম্মেলনের মাধ্যমে দেশগুলো একসাথে স্থির করেছে, তারা কেবল নিজেদের অন্তর্বর্তী নীতি গ্রহণ করবে না, বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তি বিনিময় নিশ্চিত করবে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, কপ-৩০-এর এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বের জলবায়ু নীতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিকভাবে নিঃসরণ কমিয়ে কার্বন নিরপেক্ষ পৃথিবী নিশ্চিত করা। এই উদ্যোগ যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তা বিশ্বের জনগণের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংক্ষেপে বলা যায়, ব্রাজিলে কপ-৩০ সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি কমানোর বিষয়ে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশের ঐকমত্য শুধু পরিবেশের জন্য নয়, বরং মানব জীবনের সুরক্ষা, অর্থনীতি, সামাজিক কল্যাণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিশ্ব নিরাপদ থাকবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com