গুলশান–কড়াইল এলাকায় তিতাসের অভিযানে বড় অবৈধ গ্যাস উচ্ছেদ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৪ বার
গুলশান–কড়াইল এলাকায় তিতাসের অভিযানে বড় অবৈধ গ্যাস উচ্ছেদ

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

রাজধানীর গুলশান এবং সংলগ্ন কড়াইল বস্তি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধযুদ্ধ নতুন মাত্রা পেয়েছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সাম্প্রতিক অভিযানের মধ্য দিয়ে। বহু বছর ধরে নানা চক্রের সহায়তায় বস্তি এলাকায় মূল পাইপলাইন থেকে প্লাস্টিক হোস পাইপের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল, যা শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি নয়, বরং ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছিল। অবশেষে নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে গত ১৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে মেট্রো ঢাকা বিপণন বিভাগ–৪-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এক বৃহৎ উচ্ছেদ কার্যক্রমে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে আনুমানিক ৩৫০টি ডাবল চুলার সংযোগ এবং অপসারণ করা হয়েছে প্রায় ৭০০ ফুট পাইপলাইন।

গুলশানের ৩২, ৩৩ এবং ২৮ নম্বর সড়কের বিভিন্ন জায়গা চিরদিনের মতো অন্ধকার অলি–গলির মতো দেখালেও এসবের নিচে বিপদের আরেক রূপ লুকিয়ে ছিল। কড়াইল বস্তির অনেক ঘরে যে চাহিদামতো গ্যাস জ্বলছিল, তার উৎস ছিল এসব অবৈধ লাইন। তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তা–কর্মচারী, লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের প্রতিনিধি এবং গুলশান টহল পুলিশের উপস্থিতিতে ওইসব অবৈধ সংযোগের “সোর্স লাইন কিলিং” করে কার্যত পুরো নেটওয়ার্কই বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। বহু বছর ধরে চলা এই গোপন প্রবাহ ভেঙে দেওয়ায় বস্তির শত শত পরিবারে দিনশেষে রান্নার আগুন নিভে গেলেও রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগ এবং জননিরাপত্তার স্বার্থে এটি ছিল প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত।

তবে এ লড়াই নতুন নয়। গত ২২ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শাহনেওয়াজ পারভেজ সরাসরি গুলশান পরিদর্শনে গিয়ে স্থানীয় সোসাইটি নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে একাধিক অবৈধ সংযোগ সনাক্ত করেন। তাঁর উপস্থিতিতে সেদিনই কয়েকটি প্রধান সোর্স লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সামনে তিনি বলেন, তিতাস গ্যাস নিয়মিত এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, কিন্তু দুষ্কৃতচক্র পুনরায় গুলশান এলাকার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে কড়াইল বস্তিতে অবৈধ সংযোগ স্থাপন করে থাকে। তাই গুলশান সোসাইটির সরাসরি অন্তর্ভুক্তি এই উচ্ছেদ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—অবৈধ সংযোগ প্রদান বা এতে কোনোভাবে জড়িত তিতাসের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, দায়িত্ব প্রমাণিত হলে তাদেরকে বহিষ্কার পর্যন্ত করা হবে।

অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদে শুধু তিতাস নয়, প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কঠোর মনোভাব দেখা গেছে। গত ৯ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. সিমন সরকারের নেতৃত্বে কড়াইল বস্তিতে আরেক দফা অভিযান চালানো হয়। বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিজে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি সরেজমিনে বস্তির বিভিন্ন স্থানে গিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্নের পাশাপাশি স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ান। আগুন, বিস্ফোরণ এবং মানবিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা সম্পর্কে তিনি সবাইকে সতর্ক করেন। তাঁর উপস্থিতিতে বস্তির গভীরে লুকিয়ে থাকা অনেক ‘মূল উৎপাটন লাইন’ বিচ্ছিন্ন করা হয়, যা বছরের পর বছর ধরে বিপুল ক্ষতি ডেকে আনছিল।

তবে সমস্যাটি কেবল একটি এলাকার নয়; গোটা রাজধানীজুড়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগ একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকট। তিতাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে ১৩ নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে মোট ৭৬,৩১১টি অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৪১৯টি শিল্প প্রতিষ্ঠান, ৫৪৪টি বাণিজ্যিক সংযোগ এবং ৭৫,৩৪৮টি আবাসিক সংযোগ। পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে প্রায় ১,৬৩,৬৭৫টি বার্নার এবং অপসারণ করা হয়েছে ৩১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন। এই সংখ্যাগুলো শুধু অবৈধ ব্যবহারের পরিমাণই নয়, বরং জাতীয় গ্যাস ব্যবস্থার ওপর তার গভীর প্রভাবও তুলে ধরে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ গ্যাস সংযোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নিরাপত্তা। এসব সংযোগে ব্যবহৃত নিম্নমানের প্লাস্টিক পাইপ যেকোনো সময় লিকেজ ঘটিয়ে বড় ধরনের অগ্নিকান্ড ঘটাতে পারে। কড়াইলের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একটিমাত্র আগুন ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগে না। এ ছাড়া অবৈধ সংযোগের কারণে নিয়মিত গ্রাহকদের লাইনচাপ কমে যায়, সঠিকভাবে গ্যাস না পাওয়ার কারণে ভিন্ন এলাকায় অসন্তোষ বাড়ে। অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে; রাষ্ট্র বিরাট অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে, যা জ্বালানি খাতের উন্নয়নে ব্যয় করা যেত।

এই সমস্যার পেছনে সামাজিক বাস্তবতাও বড় ভূমিকা রাখে। কড়াইলের মতো বৃহৎ বস্তিতে হাজার হাজার পরিবার বাস করে, যাদের বেশিরভাগই নিম্ন–আয়ের মানুষ। জীবিকার সীমাবদ্ধতা এবং মৌলিক সেবাপ্রাপ্তির ঘাটতির কারণে তারা কম খরচে অবৈধ গ্যাস লাইনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু এই নির্ভরশীলতা একইসঙ্গে তাদের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়ে আসে। তিতাস গ্যাস এবং স্থানীয় প্রশাসন যখন এসব লাইন বিচ্ছিন্ন করে, তখন অনেক পরিবার রান্নার অসুবিধায় পড়ে মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা সমাধানে দরকার সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা, বস্তিবাসীদের জন্য নিরাপদ ও আইনি জ্বালানির ব্যবস্থা করা এবং অপরাধচক্রকে আইনের আওতায় আনা।

বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে কড়াইল ও গুলশান এলাকার গ্যাস সংযোগ পরিস্থিতি এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। অবৈধ সংযোগ ছিন্ন করা হলে দুষ্কৃতচক্র আবার নতুন লাইন বসায়—এই চক্র ভাঙতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কোনো সমাধান নেই। গুলশান সোসাইটির অংশগ্রহণ, তিতাসের নিয়মিত অভিযান এবং প্রশাসনিক তৎপরতা মিলেই হয়তো এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান সম্ভব। একদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা, অন্যদিকে জননিরাপত্তা—দুই লক্ষ্য পূরণেই প্রয়োজন আরও কঠোর ও টেকসই পদক্ষেপ।

তিতাসের সাম্প্রতিক অভিযান তাই শুধু অবৈধ লাইন অপসারণের খবর নয়; এটি দশকের পর দশক ধরে চলমান একটি সংকটের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অবস্থানের ঘোষণা। গুলশান এবং কড়াইল এলাকার এই অভিযান গোটা রাজধানীকে বার্তা দিচ্ছে—অবৈধ সংযোগ যতবারই ফিরে আসুক, উচ্ছেদ অভিযান থামবে না। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে এটি এখন সময়ের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত