বরাদ্দ আছে, ব্যয় নেই—চলতি অর্থবছরে প্রশ্নের মুখে বেশ কয়েকটি বিভাগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩০ বার

চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ব্যয় ধীরে ধীরে বাড়লেও সার্বিক ব্যয়ের চিত্র দেখলে উদ্বেগ এখনও কাটেনি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ—আইএমইডির সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, অক্টোবর পর্যন্ত তিন লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি এডিপি বরাদ্দের মধ্যে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। যদিও গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এর অগ্রগতি কিছুটা এগিয়েছে, তবু টাকার অংকে ব্যয়ের পরিমাণ কমে এসেছে, যা সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

চলতি বছরের বাজেটে এডিপির আকার ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট করা হয়েছিল। বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা—যা গত বছরের তুলনায় ৩৯ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা কম। সরকারের যুক্তি ছিল, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ করা, অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া এবং অর্থনীতিকে চাপমুক্ত রাখার চেষ্টা। কিন্তু বরাদ্দ কমানো গেলেও শুরুটা মোটেও আশাব্যঞ্জক ছিল না। জুলাই মাসে এডিপি ব্যয় হয়েছিল মাত্র ০ দশমিক ৬৯ শতাংশ—যা রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত আগের অর্থবছরের প্রথম মাসের ব্যয়ের অর্ধেকেরও কম। ফলে শুরুতেই ব্যয়ের গতি সরকারকে চিন্তায় ফেলেছিল।

পরবর্তী মাসগুলোতে অবশ্য ব্যয় বাড়তে শুরু করে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর কিছুটা গতি ফেরানোর পর অক্টোবর শেষে এডিপি ব্যয় দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৮৭৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকায়। শতাংশের হিসাবে এ ব্যয় ভালোই অগ্রগতি নির্দেশ করে, কিন্তু টাকার অংক গত বছরের তুলনায় কম থাকায় বাস্তবিক উন্নয়ন অগ্রগতির প্রশ্ন থেকে যায়।

মন্ত্রণালয়–ভিত্তিক ব্যয়ের তালিকা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, সব দফতরের অগ্রগতি সমান নয়। বরাদ্দের হিসেবে শীর্ষ পাঁচ মন্ত্রণালয়-বিভাগের মধ্যে এবারও ব্যয়ে সবার ওপরে রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। প্রথম চার মাসেই তারা ব্যয় করেছে ৪৯৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা—যা পাকা সড়ক, পানি উন্নয়ন, নগর উন্নয়ন ও স্থানীয় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর গতি বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ব্যয় করেছে ২৬৯১ কোটি ৬ লাখ টাকা, যা প্রধানত গবেষণা, ল্যাবরেটরি উন্নয়ন এবং চলমান উচ্চ প্রযুক্তি প্রকল্পগুলোতে ব্যবহৃত হয়েছে।

অন্যদিকে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যুব ও ক্রীড়া এবং পরিবেশ–বন–জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ব্যয়ের দিক থেকে পিছিয়ে আছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—দুটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয়ের ধীরগতি বিশেষজ্ঞদের উদ্বিগ্ন করছে, কারণ এগুলোতে বরাদ্দ যথেষ্ট হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা ও দরপত্র প্রক্রিয়ার ধীরগতি বারবার বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ব্যয়ের চিত্র আরও শঙ্কাজনক হয়ে ওঠে যখন দেখা যায় কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ চার মাসে প্রায় কোনো ব্যয়ই করতে পারেনি। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং জননিরাপত্তা বিভাগ এক শতাংশেরও কম ব্যয় দেখিয়েছে। তাদের অনেক প্রকল্পই প্রাথমিক অনুমোদন, নকশা প্রণয়ন বা দরপত্র প্রক্রিয়ায় আটকে আছে বলে আইএমইডির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানায়।

এর চেয়েও অবাক করার মতো তথ্য হলো—পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনও ব্যয়ের খাতাই খুলতে পারেনি। একই অবস্থা সংসদ বিষয়ক সচিবালয়ের ক্ষেত্রেও, যেখানে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও সংসদ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ব্যয় হয়নি এক টাকাও। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শূন্য ব্যয় বরাদ্দ পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন সামঞ্জস্যের ঘাটতি প্রকাশ করে, যা ভবিষ্যৎ এডিপি পরিকল্পনায় আরও সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।

চলতি অর্থবছরের চার মাস শেষ হলেও ব্যয়ের গতি নিয়ে সংশয় কাটেনি। বরাদ্দ কমানো হলেও ব্যয় পরিকল্পনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সমন্বয় দুর্বল হলে উন্নয়ন অগ্রগতি ব্যাহত হয়ই, পাশাপাশি পরবর্তী বাজেটে অকার্যকর বরাদ্দের তালিকা আরও দীর্ঘ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ—যেসব দফতর এখনও ব্যয়ে পিছিয়ে, তাদের গতি বাড়ানো এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত