দেশের সামনে বিএনপির নতুন দায়িত্ব: রাজনীতির পথে নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্র রক্ষার দর্শন

নিজস্ব সংবাদদাতা
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ জুলাই, ২০২৫
  • ৩১ বার
দেশের সামনে বিএনপির নতুন দায়িত্ব: রাজনীতির পথে নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্র রক্ষার দর্শন

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির অবস্থান ও করণীয় নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। সম্প্রতি এক টেলিভিশন টকশোতে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, “বিএনপির এখন সময় এসেছে প্রচলিত রাজনীতির ধারা থেকে সরে এসে দেশের জন্য বৃহত্তর দায়িত্ব নেওয়ার।”

শামীম হায়দারের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক ভারসাম্য, প্রশাসনিক কাঠামো এবং জনগণের আস্থাহীনতার সংকটে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেখানে বিএনপির কাঁধে এখন রাষ্ট্র রক্ষার দায়ও অর্পিত হয়েছে। তিনি বলেন, “বিএনপির আছে রাজনীতির পরিণত অভিজ্ঞতা, আছে শাসনক্ষমতায় থাকার স্মৃতি ও দক্ষতা। এমন একটি দলের উচিত হবে না কেবল প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকা, বরং জনগণের আস্থা ফিরে পাওয়ার মতো একটি ‘স্টেটসম্যানশিপ’ ভিত্তিক রাজনীতি গড়ে তোলা।”

তিনি আরও বলেন, “বিএনপি এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেও তা কেবল নির্বাচনী শক্তি বা জনসমর্থনের হিসাব দিয়ে হবে না, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়েই তাদের ভাবতে হবে।”

শামীম হায়দারের বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও উঠে আসে। তিনি বলেন, “বর্তমানে তারা মূলত আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত, আগের সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত বলেই তাদের অবস্থান এখনো নিরপেক্ষ হয়ে উঠতে পারেনি। তারা বিএনপির সঙ্গে সম্ভাব্য ভবিষ্যতের সম্পর্ক উন্নয়নের দিকেই এগোচ্ছে, যাতে ক্ষমতার পালাবদলে নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত রাখা যায়। এ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে সমানভাবে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার—এই ধারণা অবাস্তব এবং বাংলাদেশে তার নজিরও নেই।”

তিনি রাজনীতিতে ‘ব্যানের’ সংস্কৃতি নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন। বলেন, “৭১ সালের পর জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হলেও তারা ফিরে এসেছে মাত্র সাত বছরের ব্যবধানে। জাসদও একসময় নিষিদ্ধ ছিল, পরে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই জোটবদ্ধ হয়েছে। সুতরাং রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করলেই যে তা মুছে যাবে—এই বাস্তবতা বাংলাদেশে কখনোই কার্যকর হয়নি।”

শামীম মনে করিয়ে দেন, বিএনপির কাছে এক সময় ছিল রাজনীতির বল। কিন্তু নানা সিদ্ধান্তহীনতায় ও দ্বিধায় দলটি তা হারিয়ে ফেলেছে। তার ভাষায়, “ডিসেম্বরের নির্বাচনের হুংকার ফেব্রুয়ারিতে এসে নিস্তেজ হয়ে যায়।”

অন্যদিকে, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামালের মন্তব্যেও উঠে এসেছে এক গভীর রাজনৈতিক সংকটচিত্র। তার ইউটিউব চ্যানেলের এক জরিপ অনুসারে, দেশের ৭১ শতাংশ ভোটার বিশ্বাস করেন, তারা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে যাবেন না। তিনি বলেন, “সরকারের উচিত গভীরভাবে চিন্তা করা—কেন এত বড় একটি জনগোষ্ঠী ভোট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে? এটি নির্বাচন ও গণতন্ত্রের জন্য একটি অশনিসঙ্কেত।”

মাসুদ স্পষ্ট করেন, এই আস্থাহীনতা শুধু বিরোধীদল নয়, গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপরই প্রশ্ন তুলছে। তিনি বলেন, “একটি দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তি তখনই সুদৃঢ় হয়, যখন মানুষ ভোটাধিকার চর্চায় উৎসাহী থাকে। কিন্তু যদি ভোটদানের আগ্রহই হারিয়ে ফেলে সাধারণ মানুষ, তবে তা সরকারের জন্য যেমন আত্মসমালোচনার সময়, তেমনি বিরোধীদলের জন্যও আত্মউপলব্ধির সময়।”

এ প্রসঙ্গে তিনি বর্তমান প্রধান উপদেষ্টার ‘ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নির্বাচন’ উপহার দেওয়ার ঘোষণা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “যে নির্বাচনে ভোটারই থাকবে না, সেটি কিভাবে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ হতে পারে?”

রাজনীতির এই উত্তাল প্রেক্ষাপটে উঠে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু—জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের ব্যর্থতা। গণ-অভ্যুত্থানে আহত ও শহীদ পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গঠিত এই ফাউন্ডেশন তার কার্যকারিতায় ব্যর্থ হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক উমামা ফাতেমা। আহতদের অভিযোগ, আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়ে দীর্ঘদিন ঘোরানো হয়েছে, চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া হয়নি, এমনকি দ্বিতীয় ধাপের অর্থও সময়মতো বিতরণ করা হয়নি।

তালিকার স্বচ্ছতা, হিসাবের নির্ভরযোগ্যতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। ফলে মঙ্গলবার রাতে কার্যালয়ে ভাঙচুরের মতো অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে। ফাউন্ডেশনের সিইও কামাল আকবর এ প্রসঙ্গে বলেন, “তাদের আবেগের প্রেক্ষাপট আছে, হতাশা আছে, কিন্তু চেষ্টা করা হচ্ছে সবার পাশে থাকার।”

এসব ঘটনাপ্রবাহ মিলিয়ে দেশের রাজনীতিতে আজ যে সংকট, তার মূল প্রতিফলন একটাই—জনগণের প্রত্যাশা আর রাজনৈতিক দলের ভূমিকায় বিরাট ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ব্যারিস্টার শামীম হায়দারের বক্তব্য তাই শুধু কোনো দলের প্রতি আহ্বান নয়, বরং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ধারাকেই নতুনভাবে ভাবার একটি আহ্বান। রাজনীতিকে যদি কেবল ক্ষমতার খেলা না ভেবে রাষ্ট্র রক্ষার দায়িত্ব হিসেবে দেখা যায়, তবেই বর্তমান জট খুলে সামনে এগোনো সম্ভব হবে।

এখন সময়—বিএনপি, আওয়ামী লীগ, কিংবা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক শক্তির জন্য আত্মপ্রতিফলনের। কারণ বাংলাদেশ আজ শুধু নেতৃত্ব নয়, প্রয়োজন সময়োচিত দূরদর্শী রাষ্ট্রভিত্তিক রাজনীতির।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত