প্রকাশ: ২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইউরোপের নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটে নতুন এক সামরিক সমীকরণ তৈরি হতে যাচ্ছে। রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও সামরিক তৎপরতার প্রেক্ষিতে উত্তর ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিয়ে একটি শক্তিশালী বহুজাতিক নৌবাহিনী গঠনের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ সামরিক নেতৃত্বের এই পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং রাশিয়া-পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ব্রিটিশ নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা গুইন জেনকিন্স জানিয়েছেন, এই উদ্যোগের আওতায় উত্তর ইউরোপের ১০টি দেশের সমন্বয়ে একটি যৌথ নৌবাহিনী গড়ে তোলা হবে, যা ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা অর্জন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে যুক্ত থাকবে নেদারল্যান্ডসসহ নরডিক ও বাল্টিক অঞ্চলের একাধিক দেশ। মূলত ন্যাটো জোটের সম্পূরক শক্তি হিসেবে কাজ করবে এই নতুন নৌবাহিনী, তবে এর নেতৃত্ব থাকবে ব্রিটেনের হাতে।
এই পরিকল্পনার পেছনে রয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব। ২০২২ সালে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোকে আমূল পরিবর্তন করে দিয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো এখন রাশিয়াকে শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং একটি বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর অভিযোগ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের সীমান্ত ও জলসীমার আশপাশে রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষ করে ব্রিটিশ জলসীমায় রুশ যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের আনাগোনা বাড়ার বিষয়টি লন্ডনের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ব্রিটিশ সামরিক সূত্র দাবি করেছে, গত দুই বছরে এই ধরনের অনুপ্রবেশ প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। যদিও এই দাবির বিষয়ে মস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে এবং তাদের কার্যক্রমকে স্বাভাবিক সামরিক টহল হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন নৌবাহিনী গঠনের পরিকল্পনাকে কৌশলগত প্রতিরক্ষা উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরছে ব্রিটেন। তাদের মতে, দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল এবং সমন্বিত একটি নৌবাহিনী থাকলে যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাত বা নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা করা সহজ হবে। আগামী কয়েক বছরে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নিয়মিত যৌথ মহড়া, প্রযুক্তিগত সমন্বয় এবং যুদ্ধ পরিকল্পনা বিনিময়ের মাধ্যমে এই বাহিনীকে প্রস্তুত করা হবে।
তবে এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছে না মস্কো। ক্রেমলিন থেকে জানানো হয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতেই এমন সামরিক উত্তেজনা তৈরি করছে। রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ মন্তব্য করেছেন, ইউরোপে কোনো আগ্রাসনের পরিকল্পনা তাদের নেই এবং পশ্চিমা নেতারা অযথা ভয় ছড়িয়ে সামরিক ব্যয় বাড়ানোর পথ তৈরি করছেন।
এদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সম্প্রতি রাশিয়ার তেলবাহী ট্যাঙ্কার জব্দ করার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর জবাবে নিজেদের জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ রাখতে রাশিয়া যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন শুরু করে। ফলে সমুদ্রপথে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন নৌজোট গঠনের উদ্যোগ ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি শুধু একটি সামরিক জোট নয়, বরং একটি কৌশলগত বার্তা—যে ইউরোপ এখন সম্মিলিতভাবে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে এটি ন্যাটোর ওপর চাপ কমিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, এমন উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও সামরিক প্রতিযোগিতা এবং অস্ত্রের দৌড়কে উসকে দিতে পারে। বিশেষ করে রাশিয়ার মতো একটি পরাশক্তি এই পদক্ষেপকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্য সংকটসহ নানা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মনোযোগ বিভক্ত, সেখানে ইউরোপের এই নতুন সামরিক কৌশল আবারও বিশ্ব রাজনীতিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সামনের দিনগুলোতে এই নৌজোট বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া—দুটিই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর বড় প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সব মিলিয়ে, উত্তর ইউরোপে নতুন নৌবাহিনী গঠনের এই উদ্যোগ একদিকে যেমন প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতির অংশ, অন্যদিকে তা বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন উত্তেজনার ইঙ্গিতও বহন করছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সামরিক কৌশলের এই নতুন অধ্যায় কতটা স্থিতিশীলতা আনবে, আর কতটা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করবে—তা সময়ই বলে দেবে।