ইউরোপমুখী শ্রমবাজারে নজর সরকারের, লক্ষ্য ২০ লাখ কর্মী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬
  • ৭ বার
পাঁচ বছরে ইউরোপে ২০ লাখ জনশক্তি রপ্তানির টার্গেট

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অভিবাসন অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক শ্রমবাজারকে ঘিরে তৈরি হওয়া নির্ভরতা এখন নতুন করে কৌশলগত ভাবনার কেন্দ্রে এসেছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, আঞ্চলিক সংঘাত এবং শ্রমবাজারের অনিশ্চয়তা সামনে রেখে সরকার মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপকে নতুন ও স্থিতিশীল গন্তব্য হিসেবে বিবেচনায় নিচ্ছে। বিশেষ করে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রায় ২০ লাখ দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সরকারি বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের বড় অংশই এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো দেশগুলোতে দেশের মোট বিদেশগামী কর্মীর বড় একটি অংশ কাজ করছেন। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশগামী মোট কর্মীর প্রায় ৮২ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য ও গালফ অঞ্চলে গেছেন। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহের ৬০ শতাংশেরও বেশি আসে এই অঞ্চল থেকে। এই একক নির্ভরতা বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকেরা।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে বারবার যুদ্ধ পরিস্থিতি, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অর্থনৈতিক নীতির পরিবর্তন বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে অস্থির করে তুলছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সম্পর্কিত সংঘাত এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলেছে। ফলে বিকল্প শ্রমবাজার অনুসন্ধান এখন আর কেবল অর্থনৈতিক কৌশল নয়, বরং একটি জাতীয় প্রয়োজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় শ্রমবাজারকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জনসংখ্যার বার্ধক্য, দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের প্রসারের ফলে নতুন কর্মীর চাহিদা তৈরি হয়েছে। ইতালি, গ্রিস, পর্তুগাল, স্পেন, ক্রোয়েশিয়া, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, মাল্টা, সার্বিয়া এবং অন্যান্য পূর্ব ও দক্ষিণ ইউরোপীয় দেশে নির্মাণ, কৃষি, সেবা ও স্বাস্থ্যখাতে বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন ক্রমেই বাড়ছে।

সরকারি সূত্র বলছে, ইউরোপের অন্তত এক ডজন দেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে আলোচনা চলছে। কিছু দেশের সঙ্গে ইতোমধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে ইতালির সঙ্গে নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। তবে ইউরোপীয় দেশগুলো সাধারণত সরাসরি বড় পরিমাণ শ্রমিক চাহিদাপত্র বা ডিমান্ড লেটার দেয় না; বরং অভিবাসন নীতি, দক্ষতা যাচাই এবং দ্বিপাক্ষিক শর্তের ভিত্তিতে কর্মী গ্রহণ করে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চলছে। বিভিন্ন হাইকমিশন ও দূতাবাস এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। সরকারের লক্ষ্য হলো, শুধু শ্রমিক রপ্তানি নয়, বরং দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি করে বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা।

তবে বাস্তবতা হলো, ইউরোপে বাংলাদেশের শ্রমিক উপস্থিতি এখনও সীমিত। মোট বিদেশগামী কর্মীর মাত্র পাঁচ থেকে সাত শতাংশ ইউরোপে যান। ২০২৪ সালে প্রায় ১৬ হাজার কর্মী ইউরোপে গিয়েছিলেন, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ইউরোপীয় শ্রমবাজারে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দক্ষতার অভাব, ভাষাগত দুর্বলতা, জটিল ভিসা প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ঘাটতিকে দায়ী করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশ করতে হলে শুধু শ্রমিক পাঠালেই হবে না, বরং কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। ইউরোপে কাজের জন্য সাধারণত নির্দিষ্ট ভাষাজ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। বাংলাদেশে এসব ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশি শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশি কর্মীরা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিবাসন ইমেজ বা সুনাম। ইউরোপীয় দেশগুলোর অভিযোগ, কিছু বাংলাদেশি শ্রমিক নির্ধারিত ভিসা শর্ত ভেঙে অনিয়মিতভাবে অন্য দেশে চলে যান। এই ধরনের ঘটনা বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর আস্থা সংকট তৈরি করছে। ফলে বৈধ শ্রমিক নিয়োগে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করছে ইউরোপের দেশগুলো।

সরকার এখন এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে ইউরোপমুখী কর্মীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধ অভিবাসন নিরুৎসাহিত করতে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও জোরদার করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ সফল হলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও স্থিতিশীল হবে। একই সঙ্গে একক বাজার নির্ভরতা কমে গিয়ে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হবে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষতা উন্নয়ন, এবং আন্তর্জাতিক মানের অভিবাসন ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর শ্রমবাজারের বাইরে গিয়ে ইউরোপকে নতুন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার এই উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কৌশলে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি দেশের কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক আয়ের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত