প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে সংস্থাটির সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ইরান বিশ্বকাপে অংশ নেবে এবং তাদের ম্যাচগুলো যুক্তরাষ্ট্রেই অনুষ্ঠিত হবে। তার এই বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে চলমান অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে গেছে।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ আসর হতে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। বিস্তৃত এই আয়োজনের কারণে দলগুলোকে একাধিক দেশে ভ্রমণ করতে হবে, যা কূটনৈতিক সম্পর্ক, ভিসা নীতি এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এই বাস্তবতায় ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা আরও বেশি গুরুত্ব পায়। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান মেহেদী তাজ প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানানোর পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।
ইরান ইতোমধ্যে এশিয়ান বাছাইপর্বে নিজেদের গ্রুপে শীর্ষস্থান অর্জন করে টানা চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা নিশ্চিত করেছে। দলটির ধারাবাহিক পারফরম্যান্স এবং এশিয়ান ফুটবলে তাদের শক্ত অবস্থান বিবেচনায় বিশ্বকাপে তাদের অংশগ্রহণকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের ম্যাচ আয়োজন নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই বিষয়ে কঠোর ও স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। ফিফা কংগ্রেসের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, ফুটবল মানুষের মধ্যে ঐক্য তৈরি করে এবং বিশ্বকাপের মূল দর্শনই হলো ভিন্ন সংস্কৃতি ও জাতির মানুষকে একত্রিত করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান অবশ্যই বিশ্বকাপে খেলবে এবং তাদের ম্যাচও যুক্তরাষ্ট্রেই হবে।
ইনফান্তিনোর এই বক্তব্যকে শুধু একটি প্রশাসনিক ঘোষণা নয়, বরং ক্রীড়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে ওঠার বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যে ফিফা চাইছে বিশ্বকাপকে রাজনৈতিক সংঘাতের বাইরে রাখতে এবং খেলাধুলাকে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে।
বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘জি’-তে ইরানের প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে বেলজিয়াম, মিশর এবং নিউজিল্যান্ড। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, তাদের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলস ও সিয়াটলে। পাশাপাশি নকআউট পর্বে উন্নীত হলে ডালাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে সম্ভাব্য ম্যাচও হতে পারে, যা রাজনৈতিক ও ক্রীড়াগত দুই দিক থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
তবে এই আয়োজনকে ঘিরে ভিসা ও নিরাপত্তা প্রশ্নে উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে ইরানি নাগরিকদের ওপর বিভিন্ন সময় আরোপিত বিধিনিষেধ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। যদিও ফিফা ও আয়োজক দেশগুলো বারবার আশ্বস্ত করেছে যে, বিশ্বকাপ অংশগ্রহণকারী সব দল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।
ইরান বিকল্প ভেন্যুর প্রস্তাব দিয়েছিল বলেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। ধারণা করা হচ্ছিল, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা কানাডা বা মেক্সিকোতে ম্যাচ আয়োজনের অনুরোধ জানিয়েছিল। তবে ফিফা সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি এবং পূর্বনির্ধারিত সূচি বহাল রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফিফার এই সিদ্ধান্ত বিশ্বকাপের নীতিগত অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে। সংস্থাটি বোঝাতে চেয়েছে যে, আন্তর্জাতিক ফুটবল আসরকে রাজনৈতিক বিরোধের প্রভাবে পরিচালিত হতে দেওয়া হবে না। একইসঙ্গে এটি আয়োজক দেশগুলোর ওপরও একটি দায়িত্ব আরোপ করেছে, যাতে সব দলের জন্য সমান সুযোগ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।
এদিকে ইরানের ফুটবল সমর্থকদের মধ্যেও এই ঘোষণাকে ঘিরে স্বস্তি ফিরে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সমর্থক বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়াকে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও খেলাধুলা মানুষের মধ্যে সম্পর্ক ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বকাপ ঘিরে ইতোমধ্যেই বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। নতুন ফরম্যাট, বেশি দল এবং তিন দেশের যৌথ আয়োজন এই আসরকে আরও ব্যতিক্রমী করে তুলেছে। সেই বড় মঞ্চে ইরানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়ায় টুর্নামেন্টের প্রতিযোগিতামূলক আবহও আরও সমৃদ্ধ হবে বলে মনে করছেন ক্রীড়া বিশ্লেষকেরা।
সব মিলিয়ে, ফিফার সর্বশেষ ঘোষণার মাধ্যমে ইরানের বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার অবসান ঘটেছে। এখন ফুটবলপ্রেমীদের অপেক্ষা মাঠের লড়াই দেখার, যেখানে রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং ফুটবলই হবে মূল আকর্ষণ।