যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, উত্তপ্ত মার্কিন সিনেট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬
  • ৪ বার
মার্কিন সিনেটে

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানে চলমান সামরিক সংঘাত থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে ডেমোক্র্যাটদের উত্থাপিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে পাস হয়নি। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটি ৪৭-৫০ ভোটে পরাজিত হয়, যা মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ভোটের এই ফলাফল এমন এক সময়ে এলো, যখন ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার আইনি সময়সীমা নিয়ে তীব্র আলোচনা চলছে।

ভোটাভুটির সময়টি ছিল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোল্যুশন’ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি যুদ্ধে সেনা মোতায়েনের পর ৬০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। সেই সময়সীমা শুক্রবার পূর্ণ হওয়ার কথা থাকায় এই ভোটকে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

সিনেটের এই ভোটে রিপাবলিকান দলের মাত্র দুইজন সদস্য দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট শিবিরেও বিভাজন দেখা যায়, যেখানে একজন সদস্য প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নেন। এই ভোটাভুটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে যুদ্ধ ইস্যুতে দলীয় ঐক্যের দুর্বলতা এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেসের সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাব ব্যর্থ হওয়ায় ইরান যুদ্ধের ওপর কংগ্রেসের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হলো। গত কয়েক মাসে ডেমোক্র্যাটরা একাধিকবার প্রশাসনকে যুদ্ধ বন্ধ বা অনুমোদন নেওয়ার বিষয়ে বাধ্য করার চেষ্টা করলেও প্রতিবারই তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয়েছেন।

আইন অনুযায়ী, ৬০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন না থাকলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া বৈধ নয়, তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট অতিরিক্ত ৩০ দিনের সময় নিতে পারেন। মার্চের শুরুতে প্রশাসন কংগ্রেসকে ইরানে সামরিক অভিযানের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, যার ভিত্তিতেই বর্তমান সময়সীমা গণনা করা হয়েছে। ফলে শুক্রবার সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে হোয়াইট হাউসের অবস্থান এই ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নয়। সিনেটের শুনানিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেন, যদি যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকে তবে আইনের ৬০ দিনের সময়সীমা স্থগিত থাকবে। তার এই ব্যাখ্যাকে প্রশাসনের অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও ডেমোক্র্যাটরা এটিকে সংবিধানবিরোধী ব্যাখ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

সিনেটর টিম কেইনসহ একাধিক ডেমোক্র্যাট নেতা জানিয়েছেন, সংবিধান বা ওয়ার পাওয়ারস রেজোল্যুশনে এমন কোনো বিধান নেই যেখানে যুদ্ধবিরতির অজুহাতে সময়সীমা স্থগিত হতে পারে। তাদের মতে, নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হলে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখা সরাসরি আইন লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে।

ভোটের পর সিনেটর সুসান কলিন্স এক বিবৃতিতে বলেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমাহীন নয় এবং যুদ্ধ ও শান্তির সিদ্ধান্তে কংগ্রেসের সাংবিধানিক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, যুদ্ধের একটি স্পষ্ট লক্ষ্য থাকা জরুরি, পাশাপাশি সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সুস্পষ্ট কৌশলও থাকতে হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি না হয়।

অন্যদিকে রিপাবলিকান দলের মধ্যেও এ ইস্যুতে বিভাজন লক্ষ্য করা গেছে। কিছু সিনেটর প্রশাসনের অবস্থানকে সমর্থন করলেও অন্যরা যুদ্ধ পরিচালনার ওপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার পক্ষে মত দিয়েছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম রিপাবলিকান শিবির থেকে এমন বিভক্ত মতামত প্রকাশ পেল, যা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভোটাভুটি শুধু একটি প্রস্তাবের পরাজয় নয়, বরং এটি মার্কিন সংবিধান ও যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে চলমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। ১৯৭৩ সালের আইনটি মূলত প্রেসিডেন্টের একক সিদ্ধান্তে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনা সীমিত করার উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছিল, তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

ডেমোক্র্যাটরা এখন আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। কিছু সিনেটর জানিয়েছেন, যদি নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রমের পরও ইরানে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকে, তবে প্রশাসনের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে আদালতের সরাসরি হস্তক্ষেপ খুবই সীমিত, তবুও এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক চাপ তৈরির একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এখন আরও গভীর হচ্ছে বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত। একদিকে প্রশাসন যুদ্ধকে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয় বলে দাবি করছে, অন্যদিকে কংগ্রেসের একটি অংশ এটিকে ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে দেখছে।

সব মিলিয়ে সিনেটে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের পরাজয় ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সময়সীমা শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে আগামী দিনগুলোতে এই সংঘাত কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত