যশোরে মনোনয়ন যাচাইয়ে কঠোরতা, বাতিল হলো ৭ প্রার্থীর মনোনয়ন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৯৫ বার
যশোরে মনোনয়ন যাচাইয়ে কঠোরতা, বাতিল হলো ৭ প্রার্থীর মনোনয়ন

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারী ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যশোরের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু থেকেই উত্তাপ ও কৌতূহল বিরাজ করছে। সেই প্রেক্ষাপটে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের প্রথম দিনেই যশোর-১ ও যশোর-২ আসনে জামায়াত ও বিএনপিসহ সাতজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় নির্বাচনী মাঠে নতুন করে আলোচনা ও হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে আরও চার প্রার্থীর বিষয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না দিয়ে তথ্য হালনাগাদের সুযোগ রেখে সিদ্ধান্ত স্থগিত করায় সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের মধ্যে বাড়তি সতর্কতা দেখা যাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারি সকালে যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশেক হাসান আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। তিনি জানান, নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা ও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী প্রতিটি মনোনয়নপত্র খুঁটিনাটি যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং কাউকে বিশেষভাবে সুবিধা বা অসুবিধা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যাচাই-বাছাই কার্যক্রমের প্রথম দিনেই যশোর-১ (শার্শা) ও যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র পরীক্ষা করা হয়। যশোর-১ আসনে মোট সাতজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। যাচাই শেষে তিনজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়। বাতিল হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন মফিকুল হাসান তৃপ্তি, স্বতন্ত্র প্রার্থী ও শার্শা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হাসান জহির এবং আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহজাহান আলী গোলদার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্যের অসঙ্গতি এবং বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

তবে যশোর-১ আসনের সব প্রার্থীর ভাগ্য প্রথম দিনেই চূড়ান্ত হয়নি। তথ্যের ঘাটতির কারণে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নুরুজ্জামান লিটন এবং জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম চঞ্চলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হালনাগাদ ও সঠিক তথ্য জমা দেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। এদিকে যাচাই-বাছাই শেষে এই আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মুহাম্মদ আজীজুর রহমান এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী বক্তিয়ার রহমানের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে যশোর-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।

অন্যদিকে যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে যাচাই-বাছাইয়ের ফল আরও বেশি আলোচিত হয়েছে। এই আসনে মোট ১০ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে চারজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। বাতিল হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ রয়েছেন, যার মনোনয়নপত্র ব্যাংক ঋণ বা ক্রেডিট কার্ড সংক্রান্ত জটিলতার কারণে বাতিল হয়। এছাড়া দলীয় মনোনয়নপত্র যথাযথভাবে জমা না দেওয়ায় বিএনপির মোহাম্মদ ইসহাক ও জহুরুল ইসলামের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। স্বতন্ত্র প্রার্থী মেহেদী হাসানের মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়েছে এক শতাংশ ভোটারের তথ্যসংক্রান্ত ত্রুটির কারণে।

তবে এই আসনেও কয়েকজন প্রার্থীর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি। বিএনএফ মনোনীত প্রার্থী শামসুল হকের মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর ও টিআইএন সংক্রান্ত তথ্য এবং জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী ফিরোজ শাহ’র টিআইএন ও ব্যাংক ঋণ সংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদের জন্য সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সঠিক কাগজপত্র জমা দিতে পারলে তাদের প্রার্থিতা বহাল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

যাচাই-বাছাই শেষে যশোর-২ আসনে যাদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবিরা সুলতানা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ইদ্রিস আলী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ’র প্রার্থী ইমরান খান এবং আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) প্রার্থী রিপন মাহমুদ। ফলে এই আসনে চারজন প্রার্থী আপাতত নিশ্চিতভাবে নির্বাচনী মাঠে থাকছেন।

মনোনয়ন যাচাই-বাছাই প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশেক হাসান সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার দুটি আসনের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে যশোর জেলার বাকি চারটি সংসদীয় আসনের মনোনয়নপত্র যাচাই করা হবে। তিনি জানান, আগামী ৪ জানুয়ারির মধ্যে জেলার সব ছয়টি আসনের মনোনয়ন যাচাই-বাছাই কার্যক্রম সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল মানেই তার রাজনৈতিক অধিকার শেষ হয়ে যায় না; আইন অনুযায়ী প্রত্যেক প্রার্থীই আপিল করার সুযোগ পাবেন।

এ বিষয়ে যশোর-২ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ বলেন, তার মনোনয়নপত্র বাতিলের কারণ হিসেবে যে ক্রেডিট কার্ড সংক্রান্ত বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি অনেক আগের এবং বর্তমানে সমাধান হয়ে গেছে। প্রাথমিক যাচাইয়ে মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও তিনি আপিল করবেন এবং সমস্যার সমাধান হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন ফিরে পাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, নির্বাচনী লড়াইয়ে থাকার জন্য তিনি শেষ পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করবেন।

যশোর জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর জেলার ছয়টি আসনে মোট ৪৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। এর মধ্যে বিএনপি থেকে ১০ জন, জামায়াতে ইসলামী থেকে ৬ জন, স্বতন্ত্র প্রার্থী ১০ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে ৬ জন, জাতীয় পার্টি থেকে ৬ জন মনোনয়ন দাখিল করেছেন। এছাড়া বিএনএফ, বাসদ, জাগপা, সিপিবি, খেলাফত মজলিস ও মাইনরিটি জনতা পার্টি থেকে একজন করে এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি বা এবি পার্টি থেকে দুইজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এর আগে জেলার ছয়টি আসনে মোট ৭১ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন, যা এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক আগ্রহ ও প্রতিযোগিতার মাত্রা স্পষ্ট করে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের এই কঠোরতা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় আসনভিত্তিক সমীকরণে পরিবর্তন আসতে পারে। প্রার্থীদের জন্য এটি একটি স্পষ্ট বার্তা যে, নির্বাচনী আইনের প্রতিটি ধারা ও বিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে।

সব মিলিয়ে, যশোরে মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের প্রথম দিনের ফলাফল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সামনে আপিল নিষ্পত্তি ও চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী মাঠের চূড়ান্ত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com