লোহিত সাগরের অগ্নিসংকেত: কারা এই হুথি আনসারুল্লাহ, এত অস্ত্র কোথা থেকে আসে?

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ জুলাই, ২০২৫
  • ২৭ বার
লোহিত সাগরের অগ্নিসংকেত: কারা এই হুথি আনসারুল্লাহ, এত অস্ত্র কোথা থেকে আসে?

প্রকাশ: ১২ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

লোহিত সাগর এখন আর শুধু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জলপথ নয়, হয়ে উঠেছে নতুন এক যুদ্ধক্ষেত্র। ২০২৩ সালের শেষ প্রান্ত থেকে শুরু হয়ে ২০২৫ পর্যন্ত, এখানে প্রায় একশ’ বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি আনসারুল্লাহ। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত চারটি জাহাজ ডুবেছে, নিহত হয়েছে বেশ কয়েকজন, এবং বন্দী করা হয়েছে আরও অনেককে।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—কারা এই হুথিরা? আর কীভাবেই বা এতো বড় পরিসরে তারা এই ধরনের সামরিক অভিযানের সক্ষমতা অর্জন করেছে?

কে এই হুথি আনসারুল্লাহ?
হুথি আনসারুল্লাহ হচ্ছে ইয়েমেনের সংখ্যালঘু শিয়া সম্প্রদায় জায়েদিদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক-ধর্মীয় গোষ্ঠী। তাদের আত্মপ্রকাশ ঘটে নব্বইয়ের দশকে, হুসেইন আল-হুথির নেতৃত্বে। পরে তার মৃত্যুর পর নেতৃত্ব নেন ভাই আবদুল মালিক আল-হুথি। গোষ্ঠীটি নিজেদের ‘আনসারুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর পক্ষ’ নামে অভিহিত করে।

২০০০ দশকের শুরুতে তৎকালীন ইয়েমেনি প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে হুথিরা। তারা প্রথমে উত্তরাঞ্চলের শাদা প্রদেশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং পরে ২০১৫ সালে রাজধানী সানা দখল করে প্রেসিডেন্ট আব্দরাব্বুহ মানসুর হাদিকে দেশত্যাগে বাধ্য করে।

এই উত্থানই এক নতুন আঞ্চলিক সংঘাতের জন্ম দেয়। সৌদি আরব আশঙ্কা করে, হুথিরা ইয়েমেনকে ইরানের উপগ্রহ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। ফলে রিয়াদ নেতৃত্বে একটি আরব জোট হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে নামে। কিন্তু দশকজুড়ে সংঘর্ষ সত্ত্বেও হুথিদের পুরোপুরি হটানো সম্ভব হয়নি।

বর্তমানে তারা রাজধানী সানা, শাদা প্রদেশসহ ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমের বেশিরভাগ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে। ওইসব এলাকায় নিজেদের প্রশাসন, অর্থনীতি, এমনকি মুদ্রানীতিও পরিচালনা করছে এই গোষ্ঠী।

তারা কীভাবে পেল এই সামরিক শক্তি?
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের দাবি, হুথিরা ইরানের সরাসরি সহায়তায় এত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ড্রোন, ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, বোমা বহনকারী স্পিডবোট—সবই তারা পেয়েছে ইরানের কাছ থেকে। মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ কেন্ডালের মতে, ইরানি অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য এবং প্রশিক্ষণ ছাড়া হুথিদের এই পর্যায়ের কার্যক্রম সম্ভব ছিল না।

তবে ইরান সরকার তাদেরকে অস্ত্র দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছে, যদিও ‘রাজনৈতিক ও নৈতিক’ সমর্থনের কথা স্বীকার করে এসেছে।

এছাড়া, লেবাননের হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর সঙ্গে হুথিদের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আছে বলেও জানিয়েছে ওয়েস্ট পয়েন্টের কমব্যাটিং টেরোরিজম সেন্টার। হিজবুল্লাহর কাছ থেকেও তারা প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি এবং পরামর্শ পেয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ ও সামুদ্রিক হামলা
২০২৩ সালের নভেম্বরে গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযান শুরু হলে, হুথিরা নিজেদের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ অংশ হিসেবে ঘোষণা করে ইসরাইলকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। সেইসঙ্গে তারা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে, যেগুলোর কোনো কোনোটি ইসরাইলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত ছিল।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে একটি ড্রোন তেল আবিবে আঘাত হানে, এতে একজন নিহত এবং আরও ১০ জন আহত হয়। এছাড়া, সেই বছরের সেপ্টেম্বর থেকে হুথিরা ইসরাইলি বন্দরমুখী জাহাজগুলোতে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন নৌকা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে অন্তত ৪টি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়।

মার্কিন নৌবাহিনী এক পর্যায়ে লোহিত সাগরে মোতায়েন হয় এবং হুথিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালায়। এরপর কয়েক সপ্তাহের হামলার পর ২০২৫ সালের মে মাসে হুথিদের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়, যদিও সেখানে ইসরাইলকে লক্ষ্য করে হামলা বন্ধের কোনো অঙ্গীকার ছিল না।

২০২৫ সালের জুনে ইসরাইল ইরানের সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালালে হুথিদের কার্যক্রম নতুনভাবে চাঙা হয়ে ওঠে। এক মাস পর জুলাইয়ে ইসরাইল ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতেও বিমান হামলা শুরু করে। ফলে লোহিত সাগরজুড়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নতুন করে সংকটে পড়ে।

এই সংঘাতের প্রভাব কতটা গভীর?
আন্তর্জাতিকভাবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের প্রায় ১৫ শতাংশ লোহিত সাগর হয়ে যায়। হুথিদের হামলায় এই পথ এখন অরক্ষিত। এর ফলে জ্বালানির দাম থেকে শুরু করে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ছে।

সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, “এই হামলা কেবল একটি দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং সামগ্রিকভাবে সমুদ্রপথের স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিরুদ্ধে হুমকি।”

ভবিষ্যৎ কী?
বর্তমানে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা ইয়েমেনের সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চল। তারা সেখান থেকে কর আদায় করছে, প্রশাসন চালাচ্ছে এবং নিজেদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তুলছে।

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় অস্ত্রবিরতির আওতায় শান্তিচেষ্টা চললেও লোহিত সাগরজুড়ে তাদের সামরিক উপস্থিতি ও হামলা এই চেষ্টাকে ক্রমাগত জটিল করে তুলছে।

ইসরাইল, ইরান, হিজবুল্লাহ ও হুথিদের মধ্যকার জোট-প্রতিযোগিতার কাঠামো এখন কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সীমায় আটকে নেই—এটি সরাসরি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য বড় হুমকির রূপ নিচ্ছে।

অতএব, হুথিদের অস্ত্র, মিত্রতা এবং সামরিক সক্ষমতা শুধুই একটি গোষ্ঠীর সাফল্য নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ, যার কেন্দ্রে রয়েছে এক উপেক্ষিত, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ—ইয়েমেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত