দেশে ১০–১৫টি ব্যাংকই যথেষ্ট, অতিরিক্ত ব্যাংকই সংকটের মূল: গভর্নর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭০ বার
দেশে ১০–১৫টি ব্যাংকই যথেষ্ট, অতিরিক্ত ব্যাংকই সংকটের মূল: গভর্নর

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে স্পষ্ট ও কঠোর ভাষায় বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেছেন, একটি দেশের জন্য ১০ থেকে ১৫টি শক্তিশালী ও সুশাসিত ব্যাংকই যথেষ্ট হতো। অথচ বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাংকের সংখ্যা ৬৪টি, যা আর্থিক খাতের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত ব্যাংকের কারণে প্রশাসনিক ব্যয় বেড়েছে, নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়েছে এবং সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাত ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ব্যাংকের সংখ্যা কমানো গেলে ব্যয় হ্রাস পাবে, দক্ষতা বাড়বে এবং শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশও বৃদ্ধি পাবে।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ব্যাংকিং খাত : বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক বিশেষ বক্তৃতায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন গভর্নর। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো গভর্নেন্স ফেইলর বা সুশাসনের ঘাটতি। রাজনৈতিক প্রভাব, সরকার ও প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা পরিবারের নির্দেশে দীর্ঘদিন ধরে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দায়িত্বহীনতা ও অবহেলা রয়েছে, যা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এই দুর্বল সুশাসনের ফলেই আজ ব্যাংক খাত বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।

তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর বর্তমান দুরবস্থার অন্যতম কারণ হলো মালিকানাভিত্তিক ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ। ব্যাংকগুলো কার্যত কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছিল। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ইসলামী ঘরানার পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, কারণ এসব ব্যাংকই একই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স না থাকায় এই ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় তিন লক্ষ কোটি টাকার মতো অর্থ দেশের বাইরে চলে গেছে বলে ধারণা করা হয়, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ ক্ষতি।

বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে গভর্নর বলেন, পৃথিবীতে আর্থিক খাত সাধারণত চারটি প্রধান স্তম্ভের মধ্যে বিভক্ত। এর মধ্যে ব্যাংকিং খাত সাধারণত তৃতীয় স্থানে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে ব্যাংকিং খাতই প্রথম স্থানে চলে এসেছে, ফলে অন্যান্য আর্থিক খাত যেমন বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজার কাঙ্ক্ষিতভাবে গড়ে ওঠেনি। এর ফলে দেশের আর্থিক কাঠামো ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টেকসই পথে ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরশীল হলে চলবে না। ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি অন্যান্য আর্থিক খাতকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে বন্ড মার্কেট ও স্টক মার্কেটকে শক্তিশালী করা জরুরি। এসব খাত শক্তিশালী না হওয়ায় সরকার ও বেসরকারি খাত উভয়ই অতিমাত্রায় ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।

দেশের আর্থিক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার কথা তুলে ধরে গভর্নর বলেন, সব সরকারই দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যাংকই ছিল প্রধান ভরসা। কিন্তু ব্যাংকিং খাত মূলত স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অর্থায়নের জন্য উপযোগী। বাংলাদেশে ২০ থেকে ২৫ বছর মেয়াদি ঋণ দেওয়ার মতো কাঠামো ব্যাংকগুলোর নেই। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়।

তিনি বলেন, আমাদের সিস্টেম এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে, ঋণ দেওয়ার পরপরই গ্রাহককে চাপে রাখা হয়। এতে উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে আগ্রহ হারান এবং নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য ব্যাংকিং খাতের বাইরে শক্তিশালী বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি।

ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হওয়া মানেই প্রতিযোগিতা ভালো হবে—এই ধারণা সব সময় সঠিক নয়। বরং অতিরিক্ত ব্যাংকের কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর চাপ বাড়ে, তদারকি দুর্বল হয় এবং অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কম সংখ্যক কিন্তু শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যাংক থাকলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল হতে পারে।

অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাত সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ধাপে ধাপে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে, ঋণ খেলাপির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে সময় লাগবে, তবে বিকল্প কোনো পথ নেই।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের সংকট শুধু অর্থনীতির সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যাও। এই সংকট থেকে উত্তরণে গবেষণা, নীতিগত সংস্কার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ্ বলেন, গভর্নরের বক্তব্য দেশের অর্থনীতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে এবং এটি নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষার্থীরা ব্যাংক একীভূতকরণ, খেলাপি ঋণ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। গভর্নর সেগুলোর উত্তর দিতে গিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে চায় এবং ভবিষ্যতে আরও শক্ত ভূমিকা রাখার চেষ্টা করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গভর্নরের এই বক্তব্য ব্যাংকিং খাত সংস্কার নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেবে। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সংস্কার যে সময়ের দাবি, তা আবারও স্পষ্ট হলো।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত