৫ ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য ৪% মুনাফায় স্বস্তির বার্তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৯ বার
৫ ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য ৪% মুনাফায় স্বস্তির বার্তা

প্রকাশ: ২২  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের ব্যাংকিং খাতে চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগে ঘোষিত ‘হেয়ারকাট’ নীতির ফলে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের আমানতের ওপর কোনো মুনাফা না দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে আংশিকভাবে সরে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই দুই বছরের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা ৪ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন। ফলে পুরোপুরি মুনাফা বাতিলের যে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত অনেকটাই কেটে গেল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র জানায়, বুধবার রাতে একীভূত প্রক্রিয়াধীন সব ব্যাংকের প্রশাসকদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে এই সংশোধিত সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য ব্যক্তিগত ও মেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রে ৪ শতাংশ হারে মুনাফা প্রদান করা হবে। একই সঙ্গে জানানো হয়েছে, ২০২৬ সাল থেকে বাজারভিত্তিক মুনাফা ব্যবস্থা কার্যকর হবে। সে ক্ষেত্রে মুনাফার হার সাড়ে ৮ শতাংশ থেকে সাড়ে ১০ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বাজার পরিস্থিতি ও ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।

এর আগে গত ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক এক চিঠির মাধ্যমে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য কঠোর সিদ্ধান্ত জানায়। সেই চিঠিতে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমানতের ওপর কোনো মুনাফা প্রযোজ্য হবে না। এমনকি কেউ যদি এই সময়ের মধ্যে মুনাফা তুলে নিয়ে থাকেন, তাহলে তা ‘হেয়ারকাট’ হিসেবে মূল আমানত থেকে সমন্বয় করা হবে। অর্থাৎ, গ্রাহকের জমা টাকার মূল অংশ থেকেই কেটে নেওয়ার নির্দেশনা ছিল। এই ঘোষণার পরপরই ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।

বিশেষ করে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়। বহু মানুষ তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় এসব ব্যাংকে রেখে নিয়মিত মুনাফার ওপর নির্ভর করে সংসার পরিচালনা করেন। হঠাৎ করে দুই বছরের মুনাফা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে অনেকেই অমানবিক ও আস্থাহানিকর বলে মন্তব্য করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকরাও বলেন, ব্যাংক সংস্কারের নামে আমানতকারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করলে তা পুরো ব্যবস্থার প্রতি আস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন এবং আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে। পুরোপুরি মুনাফা বাতিলের পরিবর্তে ন্যূনতম ৪ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে একদিকে ব্যাংকগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে, অন্যদিকে আমানতকারীরাও সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হবেন না।

তবে এই মুনাফা সুবিধা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে, শুধু ব্যক্তিগত ও মেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রেই ৪ শতাংশ মুনাফা দেওয়া হবে। প্রাতিষ্ঠানিক আমানত, চলতি হিসাব কিংবা অন্যান্য বিশেষ ধরনের আমানতের ক্ষেত্রে এই সুবিধা কার্যকর হবে না। ফলে বড় করপোরেট গ্রাহক বা স্বল্পমেয়াদি আমানতকারীরা আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুনাফাবিহীনই থাকবেন।

বর্তমানে যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে, সেগুলো হলো এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এসব ব্যাংকে মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। বিপুল এই অঙ্কের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারী, যাদের বড় একটি অংশ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। তাদের জন্য মুনাফার বিষয়টি শুধু আর্থিক লাভ নয়, বরং জীবনের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ব্যাংকের দুর্বল ব্যবস্থাপনা, খেলাপি ঋণের চাপ এবং তারল্য সংকটের কারণে একীভূতকরণ ছাড়া বিকল্প পথ ছিল না। তবে সংস্কার প্রক্রিয়ায় আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন সিদ্ধান্ত সেই দিক থেকে একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। যদিও ৪ শতাংশ মুনাফা বর্তমান বাজারের তুলনায় কম, তবু এটি ‘শূন্য মুনাফা’র তুলনায় অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে বাজারভিত্তিক মুনাফা ব্যবস্থা চালু হলে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা বাড়বে। তবে একীভূত ব্যাংকগুলোকে দ্রুত আর্থিকভাবে শক্ত অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে না পারলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা পর্ষদ এবং ঋণ আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখা জরুরি।

সাধারণ আমানতকারীদের প্রতিক্রিয়ায় দেখা গেছে, নতুন সিদ্ধান্তে তারা কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছেন। অনেকেই বলছেন, দুই বছর কোনো মুনাফা না পাওয়ার চিন্তা তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। এখন অন্তত ন্যূনতম কিছু মুনাফা পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকায় তারা ব্যাংকে টাকা রাখার বিষয়ে আগের মতো আতঙ্ক বোধ করছেন না। তবে তারা একই সঙ্গে চান, ভবিষ্যতে যেন এমন হঠাৎ সিদ্ধান্ত না আসে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা যেন অটুট থাকে।

সব মিলিয়ে, পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য ৪ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাতে চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতার প্রতিফলন। এটি দেখায় যে, চাপের মুখে হলেও নীতিনির্ধারকেরা জনস্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে প্রস্তুত। এখন দেখার বিষয়, বাজারভিত্তিক মুনাফা ব্যবস্থায় যাওয়ার পর এই ব্যাংকগুলো কতটা স্থিতিশীল হতে পারে এবং আমানতকারীদের আস্থা কতটা পুনরুদ্ধার হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত