প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শীত এলেই গ্রামবাংলায় খেজুরের কাঁচা রসের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়ে যায়। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে গাছ থেকে নামানো মিষ্টি কাঁচা রস অনেকের কাছেই শীতের অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু এই লোভনীয় পানীয়ই যে কখনো কখনো প্রাণঘাতী ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে, তা অনেকেই ভুলে যান। প্রতিবছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন জেলায় নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আবারও সতর্কবার্তা দিচ্ছেন—খেজুরের কাঁচা রস পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
নিপাহ ভাইরাস একটি মারাত্মক জুনোটিক রোগের জন্য দায়ী। জুনোটিক ডিজিজ বলতে বোঝায় এমন রোগ, যা প্রাণী থেকে মানুষের দেহে সংক্রমিত হয়। বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসের প্রধান উৎস হলো ফলখেকো বাদুড়। এই বাদুড় সাধারণত খেজুরগাছের রসের প্রতি আকৃষ্ট হয়। শীতকালে ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত যখন খেজুরের রস সংগ্রহ করা হয়, তখনই নিপাহ সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
খেজুরগাছের সঙ্গে হাঁড়ি বেঁধে রস সংগ্রহের সময় বাদুড় রাতের বেলায় এসে সেই রস পান করে। রস খাওয়ার সময় বাদুড়ের লালা, কখনো মলমূত্রও হাঁড়ির ভেতরে পড়ে যায়। যদি সেই বাদুড় নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত থাকে, তবে রসটি ভয়ংকরভাবে দূষিত হয়ে পড়ে। সকালে সেই কাঁচা রস মানুষ পান করলে খুব সহজেই ভাইরাসটি মানবদেহে প্রবেশ করে। শুধু কাঁচা রসই নয়, বাদুড়ে খাওয়া ফলের আংশিক অংশ খেলেও নিপাহ ভাইরাস ছড়াতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর সাধারণত ৫ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। শুরুতে এটি সাধারণ জ্বর বা ফ্লুর মতো মনে হতে পারে। জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দেয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই রোগটি ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। রোগীর খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট, কাশি, বমি, পেটব্যথা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ভাইরাসটি মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটিয়ে এনসেফালাইটিস সৃষ্টি করে। তখন রোগী প্রলাপ বকতে শুরু করে, মানসিক ভারসাম্য হারায়, অজ্ঞান হয়ে পড়ে এবং খিঁচুনি বাড়তে থাকে।
চিকিৎসকরা বলছেন, নিপাহ ভাইরাসের মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। সময়মতো হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসা না পেলে রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারে। যারা বেঁচে যান, তাদের অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় ভোগেন। স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, স্নায়বিক দুর্বলতা কিংবা স্থায়ী পঙ্গুত্বও দেখা দিতে পারে। এ কারণেই নিপাহ ভাইরাসকে সাধারণ কোনো সংক্রমণ হিসেবে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নিপাহ ভাইরাসের কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ বা টিকা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। চিকিৎসা বলতে মূলত রোগীর লক্ষণ অনুযায়ী সাপোর্টিভ চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুরুতর অবস্থায় রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়। শ্বাসকষ্ট হলে অক্সিজেন দেওয়া, খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে ওষুধ দেওয়া এবং অন্যান্য জটিলতা সামাল দেওয়াই চিকিৎসার মূল ভিত্তি। তাই এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগেই প্রতিরোধই একমাত্র কার্যকর উপায়।
প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা বারবার খেজুরের কাঁচা রস পান না করার ওপর জোর দিচ্ছেন। রস পান করতেই হলে সেটি ভালোভাবে টগবগ করে ফুটিয়ে ঠান্ডা করে নেওয়ার পর পান করা নিরাপদ। এতে ভাইরাস ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একই সঙ্গে রস সংগ্রহের সময় হাঁড়ি এমনভাবে ঢেকে রাখতে হবে, যাতে বাদুড়ের লালা বা মলমূত্র রসের সঙ্গে মিশতে না পারে। রস সংগ্রহকারীদের মাস্ক ব্যবহার করা এবং কাজ শেষে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়ার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া ফলমূল খাওয়ার আগে পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। পাখি বা বাদুড়ে খাওয়া আংশিক ফল কখনোই খাওয়া উচিত নয়। নিপাহ আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শ থেকেও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। তাই রোগীর সেবা করার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং পরিচর্যার পর অবশ্যই সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় খেজুরের কাঁচা রস পান করার প্রবণতা বেশি থাকায় ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে বেশি। চিকিৎসকরা বলছেন, এই সময়ে কেউ যদি খেজুরের কাঁচা রস পান করার পর জ্বর, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি বা অজ্ঞান হয়ে পড়েন, তাহলে দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।
খেজুরের কাঁচা রস আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ হলেও জীবনের চেয়ে বড় কিছু নয়। সামান্য অসতর্কতা একটি পরিবারকে চিরদিনের জন্য শোকের ছায়ায় ডুবিয়ে দিতে পারে। তাই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত সচেতনতাই পারে নিপাহ ভাইরাসের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি কমাতে। শীতের আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে যেন আমরা অজান্তেই নিজের ও প্রিয়জনের জীবনের জন্য হুমকি ডেকে না আনি—এটাই এখন সবচেয়ে বড় বার্তা।