ব্যাংক হিসাবহীনতায় শীর্ষ আটে বাংলাদেশ, উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ফিনডেক্স

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৭ বার
ব্যাংক হিসাবহীনতায় শীর্ষ আটে বাংলাদেশ, উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ফিনডেক্স

প্রকাশ: ২৩  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বব্যাপী আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর নানা উদ্যোগ, ডিজিটাল ব্যাংকিং ও মোবাইল আর্থিক সেবার বিস্তার সত্ত্বেও এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। সেই বাস্তবতারই এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘গ্লোবাল ফিনডেক্স ডেটাবেজ ২০২৫’ প্রতিবেদন। এতে দেখা গেছে, বিশ্বের যেসব প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কোনো সক্রিয় ব্যাংক হিসাব নেই, তাঁদের অর্ধেকেরও বেশি—প্রায় ৫৩ শতাংশ—মাত্র আটটি দেশের নাগরিক। এই তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশও, যা দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বাস্তব অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ১৩০ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কোনো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে একক বা যৌথ হিসাব নেই। এদের মধ্যে ৬৫ কোটির বেশি মানুষই বাস করেন বাংলাদেশ, চীন, মিসর, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া ও পাকিস্তানে। জনসংখ্যার দিক থেকে বড় দেশ হওয়ায় এসব দেশে ব্যাংক হিসাবহীন মানুষের সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু জনসংখ্যার বিষয় নয়; বরং আর্থিক সচেতনতা, সেবার সহজলভ্যতা ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

প্রতিবেদনটি দেখাচ্ছে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে ব্যাংক হিসাব এখন প্রায় সার্বজনীন। সেখানে প্রায় সব প্রাপ্তবয়স্ক মানুষই কোনো না কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। বিপরীতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ব্যাংক হিসাব না থাকা মানুষের সংখ্যা এখনো উল্লেখযোগ্য। যদিও গত এক দশকে বিশ্বব্যাপী আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে বড় অগ্রগতি হয়েছে, তবু বৈষম্য পুরোপুরি দূর হয়নি। ২০১১ সালে যেখানে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কোনো আর্থিক হিসাব ছিল না, সেখানে ২০২১ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৬ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে এই হার আরও কমে ২১ শতাংশে নেমেছে। তবু বাস্তবতা হলো, এখনো প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই তথ্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দেশে দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর নানা কর্মসূচি চালু রয়েছে। রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো এজেন্ট ব্যাংকিং, স্কুল ব্যাংকিং, স্বল্পমূল্যের হিসাব এবং মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে গ্রাহক বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তা সত্ত্বেও ফিনডেক্সের এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান থেকে বোঝা যায়, এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অগ্রগতি হয়নি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবীব মনে করেন, আন্তর্জাতিক জরিপের তথ্য দেশের বাস্তব অবস্থার পুরোপুরি প্রতিফলন নাও হতে পারে। তিনি বলেন, দেশে প্রকৃত অর্থে কত শতাংশ মানুষ আর্থিকভাবে অন্তর্ভুক্ত—তার নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। একটি জাতীয় পর্যায়ের জরিপ সম্পন্ন হলেও তার ফলাফল প্রকাশ না হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। তাঁর মতে, ফিনডেক্স জরিপে ফোনভিত্তিক সীমিতসংখ্যক মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়, যা বাংলাদেশের মতো দেশের সামগ্রিক বাস্তবতাকে পুরোপুরি তুলে ধরে না।

তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন, তথ্যের ঘাটতি ছাড়াও দেশে ব্যাংক হিসাব কম থাকার পেছনে বেশ কিছু কাঠামোগত ও সামাজিক কারণ রয়েছে। অনেক মানুষের কাছে এখনো ব্যাংকে যাওয়াটা জটিল ও ভীতিকর মনে হয়। নিম্ন আয়ের ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশ ব্যাংকগুলো এখনো পুরোপুরি গড়ে তুলতে পারেনি। শুধু হিসাব খুলে দিলেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্পন্ন হয় না—এই বাস্তবতা বারবার তুলে ধরছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংক হিসাবহীন মানুষের বড় অংশই সমাজের প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ১৩০ কোটি হিসাবহীন মানুষের মধ্যে ৭০ কোটির বেশি, অর্থাৎ ৫৫ শতাংশ নারী। এ ছাড়া ৬৭ কোটি মানুষ আয়ের দিক থেকে সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে। শিক্ষার ক্ষেত্রেও বড় বৈষম্য রয়েছে—৭৯ কোটি মানুষ, যা মোট হিসাবহীন জনগোষ্ঠীর ৬২ শতাংশ, প্রাথমিক শিক্ষা বা তার কম শিক্ষিত। কর্মসংস্থানের দিক থেকেও তারা পিছিয়ে; ৬৯ কোটি মানুষ কর্মসংস্থানের বাইরে বা বেকার।

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, হিসাব না থাকা মানুষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ তরুণ। প্রায় ৩৮ কোটি মানুষের বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। এই তরুণ জনগোষ্ঠী যদি আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়, তবে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে ব্যাংক হিসাব না থাকার প্রধান কারণ হিসেবে কয়েকটি বাধা চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হলো পর্যাপ্ত অর্থের অভাব। অনেকেই মনে করেন, তাঁদের আয় এত কম যে ব্যাংক হিসাব খোলা বা পরিচালনা করা অর্থহীন। উদাহরণ হিসেবে মিসরের কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে ব্যাংক হিসাব না থাকা মানুষের প্রায় ৯০ শতাংশই জানিয়েছেন, তাঁদের কাছে হিসাব পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই। এ ছাড়া আর্থিক সেবার উচ্চ ফি, পরিবারের অন্য সদস্যের নামে হিসাব থাকা, ব্যাংকের দূরত্ব, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার অভাব এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জটিলতাও বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।

এই বাস্তবতায় মোবাইল আর্থিক সেবা একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে। সাশ্রয়ী ও সহজ সেবার কারণে অনেক মানুষ ব্যাংকের পরিবর্তে এমএফএসে ঝুঁকছেন। তবে এখানেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আর্থিক সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব অনেককে ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করে। দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে, লাতিন বর্ণমালা পড়তে না পারা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। মোবাইলে আসা বার্তা বা নির্দেশনা বুঝতে না পারায় তারা অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

বাংলাদেশে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ডেটার উচ্চমূল্যও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথে বড় বাধা। যদিও ডিজিটাল রূপান্তরের কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে অনেক দরিদ্র মানুষের জন্য স্মার্টফোন ও নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার এখনো বিলাসিতা। ফলে তারা আধুনিক আর্থিক সেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকছেন।

মিডল্যান্ড ব্যাংকের রিটেইল ডিস্ট্রিবিউশন বিভাগের প্রধান মো. রাশেদ আকতার মনে করেন, বাংলাদেশের তুলনামূলক কম সাক্ষরতার হারও ব্যাংক হিসাব না থাকার একটি বড় কারণ। তাঁর মতে, এজেন্ট ব্যাংকিং ও ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে গ্রাহকের কাছে পৌঁছাচ্ছে। তিনি আশাবাদী যে, এসব উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে সামনে পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং আরও বেশি মানুষ প্রকৃত অর্থে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আসবে।

বিশেষজ্ঞরা একমত যে, শুধু হিসাব খোলার সংখ্যা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। একটি ব্যাংক হিসাবের মূল উদ্দেশ্য হলো ঋণ, সঞ্চয় ও বিমাসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সুবিধায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। মানুষ যখন এসব সেবার ব্যবহার ও উপকারিতা বুঝবে এবং তা দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগাতে পারবে, তখনই প্রকৃত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্ভব হবে।

বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদন নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ডিজিটাল উন্নয়নের আলোচনার আড়ালে এখনো একটি বড় জনগোষ্ঠী রয়ে গেছে, যারা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে। বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হলে সচেতনতা, সাশ্রয়ী সেবা এবং মানুষের আস্থা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত