আদানি শেয়ারে আবার ধস, এক দিনে সম্পদ কমল ৫৭০ কোটি ডলার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৮ বার
আদানি শেয়ারে আবার ধস, এক দিনে সম্পদ কমল ৫৭০ কোটি ডলার

প্রকাশ: ২৪  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের করপোরেট ইতিহাসে ‘আদানি’ নামটি এখন আর শুধু সাফল্য কিংবা বিস্তারের প্রতীক নয়, বরং অনিশ্চয়তা ও বিতর্কের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। তিন বছর আগে ২০২৩ সালের ২৫ জানুয়ারি হিনডেনবার্গ রিসার্চের প্রতিবেদন প্রকাশের পর যেভাবে আদানি গোষ্ঠী শেয়ারবাজারে ভয়াবহ ধাক্কা খেয়েছিল, ঠিক তেমনই এক দুঃস্বপ্নের পুনরাবৃত্তি যেন আবার দেখা গেল ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে। যদিও এবারের ঘটনায় হিনডেনবার্গ সরাসরি জড়িত নয়, তবুও যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার আইনি পদক্ষেপের খবরে আবারও ধসে পড়েছে আদানি গোষ্ঠীর শেয়ারদর।

২৩ জানুয়ারি, ২০২৬—ভারতের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসটি আদানি গোষ্ঠীর জন্য রীতিমতো আতঙ্কের দিনে পরিণত হয়। এক দিনের ব্যবধানে আদানি গোষ্ঠীর তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বাজার মূলধন কমে যায় প্রায় ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় এক লাখ এক হাজার কোটি রুপিরও বেশি। এই পতনের সরাসরি প্রভাব পড়ে গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানির ব্যক্তিগত সম্পদের ওপরও। ফোর্বস ম্যাগাজিনের হিসাব অনুযায়ী, মাত্র এক দিনেই গৌতম আদানির সম্পদমূল্য কমে যায় ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫৭০ কোটি ডলার। এর ফলে বিশ্বের ধনীদের তালিকায় তাঁর অবস্থান নেমে আসে ৩০তম স্থানে।

এই ধস বিনিয়োগকারীদের স্মৃতিতে আবারও ফিরিয়ে এনেছে ২০২৩ সালের সেই অস্থির সময়ের কথা। সেবার হিনডেনবার্গ রিসার্চ অভিযোগ করেছিল, আদানি গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে জালিয়াতি ও বাজার কারসাজির মাধ্যমে নিজেদের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়েছে। ওই প্রতিবেদনের পরপরই আদানি গোষ্ঠীর ১০টি কোম্পানির বাজার মূলধন এক দিনে কমে গিয়েছিল প্রায় এক লাখ কোটি রুপি। যদিও পরবর্তী সময়ে ভারতের বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে রায় দেয়, তবুও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় যে গভীর ফাটল ধরেছিল, তার পুরোপুরি মেরামত হয়নি বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এবারের ধসের পেছনের কারণ হিনডেনবার্গ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) সাম্প্রতিক আইনি পদক্ষেপ। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এসইসি গৌতম আদানি ও তাঁর আত্মীয় সাগর আদানিকে জালিয়াতি ও ঘুষ দেওয়ার পরিকল্পনার অভিযোগে সরাসরি ই–মেইলের মাধ্যমে সমন পাঠানোর অনুমতি চেয়ে মার্কিন আদালতে আবেদন করেছে। এই খবরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

মূল অভিযোগের সূত্রপাত ২০২৪ সালের নভেম্বরে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ দাবি করে, আদানি গ্রিন এনার্জির উৎপাদিত বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থা করতে ভারতের কিছু সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন আদানি গ্রুপের কয়েকজন নির্বাহী। আদানি গ্রিন এনার্জি আদানি গোষ্ঠীরই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই এসইসি গৌতম আদানি ও সাগর আদানির বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা করে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ আলাদাভাবে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে, যার বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো চলমান।

যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, যেসব বিদেশি কোম্পানি মার্কিন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে, তারা ব্যবসা পাওয়ার জন্য বিদেশে ঘুষ দিতে পারে না এবং বিনিয়োগ আহ্বানের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করাও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। যদিও আদানি গ্রিনের শেয়ার সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, তবে বৈশ্বিক ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মার্কিন বিনিয়োগকারীরা আদানি গোষ্ঠীর শেয়ারে বিনিয়োগ করতে পারেন। ফলে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ জড়িত থাকায় মার্কিন আদালতের এখতিয়ার প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে এসইসি আদালতকে জানিয়েছে, গত বছর আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক পথে ভারতে সমন জারির জন্য দুটি অনুরোধ জানানো হলেও ভারত সেগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে এবার সরাসরি ই–মেইলের মাধ্যমে সমন পাঠানোর অনুমতি চাওয়া হয়েছে। ভারতের কোনো বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের আইনি উদ্যোগ নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

আদানি গোষ্ঠী অবশ্য বরাবরের মতোই সব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, নিজেদের সুনাম ও স্বার্থ রক্ষায় সম্ভাব্য সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে ২১ জানুয়ারির সর্বশেষ এসইসি নথি নিয়ে রয়টার্স মন্তব্য চাইলে আদানি গোষ্ঠী তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এই নীরবতাও বাজারে নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে।

স্বাধীন বাজার বিশ্লেষক অম্বারিশ বালিগা রয়টার্সকে বলেন, বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ ভেবেছিল, হিনডেনবার্গ অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে এবং আদানি গোষ্ঠী দায়মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে এসইসির এই নথি সামনে আসায় সেই ধারণা ভেঙে পড়েছে। ফলে আতঙ্কিত বিনিয়োগকারীরা দ্রুত শেয়ার বিক্রি শুরু করেন।

এর প্রভাব শুধু আদানি গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। শুক্রবার এই খবর প্রকাশ্যে আসার পর ভারতের শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক সেনসেক্স ও নিফটিতেও বড় ধরনের পতন দেখা যায়। এক দিনে সেনসেক্স ৭৬৯ পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় ৮১ হাজার ৫৩৭ পয়েন্টে, আর নিফটি কমে যায় ২৪১ পয়েন্ট, দিন শেষে সূচকটি থামে ২৫ হাজার ৪৮ পয়েন্টে। বাজার বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ওই দিন বিনিয়োগকারীদের মোট মূলধন কমেছে প্রায় ৬ লাখ ৮ হাজার কোটি রুপি।

বিশেষ করে আদানি গ্রিন, আদানি এন্টারপ্রাইজেস, আদানি এনার্জি এবং আদানি পোর্টসের শেয়ারে বিক্রির চাপ ছিল সবচেয়ে বেশি। দিনের মধ্যে কোনো কোনো শেয়ারের দর ১৪ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়। এই পতন এমন এক সময়ে এলো, যখন ভারতের শেয়ারবাজার এমনিতেই চাপে রয়েছে। বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছেন, যার প্রভাব পড়ছে ভারতীয় মুদ্রা রুপির ওপরও। ডলারের বিপরীতে রুপির দরপতন প্রায় প্রতি সপ্তাহেই নতুন রেকর্ড গড়ছে।

এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৬৪ দশমিক ৩৫ ডলারে পৌঁছায়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে ভারতের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে চাপ বাড়ার আশঙ্কা থাকে, যা শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

হিনডেনবার্গের অভিযোগ থেকে সেবির রায়ে মুক্তি পেলেও আদানি গোষ্ঠীর সামনে যে ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে যায়নি, সাম্প্রতিক এই ঘটনা তা আবারও স্পষ্ট করেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে চলমান আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে এবং নতুন কোনো তথ্য সামনে এলে আদানি গোষ্ঠীর শেয়ারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ আদানি গোষ্ঠীর জন্য আবারও এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে শুধু আইনি লড়াই জেতাই নয়, বরং স্বচ্ছতা ও করপোরেট শাসনের প্রশ্নে আরও শক্ত বার্তা দিতে হবে—এমনটাই মনে করছেন বাজার পর্যবেক্ষকেরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত