ইতিহাসে প্রথম ৫ হাজার ডলার ছাড়াল স্বর্ণের দাম

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬১ বার
ইতিহাসে প্রথম ৫ হাজার ডলার ছাড়াল স্বর্ণের দাম

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও মুদ্রাবাজারের অস্থিরতার মধ্যে ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক ছুঁয়েছে স্বর্ণের দাম। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। বিনিয়োগকারীদের কাছে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত এই মূল্যবান ধাতুর দামে এমন উল্লম্ফন বৈশ্বিক বাজারে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ডলারের দুর্বলতা এবং সুদহার নিয়ে অনিশ্চয়তাই এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি।

বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি আউন্স ৫ হাজার ৮৮.৫২ ডলারে। কেবল গত এক বছরেই স্বর্ণের দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশের বেশি, যা আধুনিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা। একইসঙ্গে রুপার দামেও দেখা গেছে নজিরবিহীন উত্থান। গত শুক্রবার রুপার দাম প্রতি আউন্সে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, আর চলতি সপ্তাহে তা আরও বেড়ে ১০৮ ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে। ফলে মূল্যবান ধাতুর বাজারে এক ধরনের ‘বুল রান’ বা লাগাতার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক উত্তেজনাও এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ, ইরানকে ঘিরে নতুন করে হুমকি এবং গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে সাধারণত বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে এসে স্বর্ণ ও রুপার মতো নিরাপদ বিনিয়োগে ঝুঁকে পড়েন। ফলে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।

ডলারের সাম্প্রতিক দরপতনও স্বর্ণের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলার দুর্বল হলে সাধারণত স্বর্ণের দাম বাড়ে, কারণ ডলারের বাইরে থাকা বিনিয়োগকারীদের জন্য তখন স্বর্ণ তুলনামূলক সস্তা হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের মুদ্রা ইয়েনকে সমর্থন দিতে যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নিতে পারে—এমন জল্পনার কারণে এশিয়ার বাজারে ডলার কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ট্রেডারদের সঙ্গে ইয়েনের বিনিময় হার নিয়ে যোগাযোগ করেছে—এমন প্রতিবেদনের পর জাপানি মুদ্রায় হঠাৎ উত্থান ঘটে। এর ফলে ডলারের বিপরীতে ইয়েন এক শতাংশের বেশি শক্তিশালী হয়ে ১৫৩.৮৯-এ দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতি স্বর্ণের দাম বাড়ার জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতিও বাজারে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি হুমকি দিয়েছেন, কানাডা যদি চীনের সঙ্গে কোনো নতুন বাণিজ্য চুক্তি করে, তাহলে দেশটির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এই ধরনের কড়া বক্তব্য বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগকারীদের আচরণে। এর পাশাপাশি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মুদ্রাস্ফীতি, বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ কেনার প্রবণতা এবং চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ আবারও সুদের হার কমাতে পারে—এমন প্রত্যাশাও স্বর্ণের চাহিদা বাড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণ কেনার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ডলারনির্ভরতা কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে নিরাপদ রাখতে অনেক দেশই স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে। এই প্রবণতা বাজারে স্বর্ণের সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনছে, যা দামের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো এই ক্ষেত্রে বেশ সক্রিয়।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মোট প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার ২৬৫ টন স্বর্ণ উত্তোলন করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে অলিম্পিকের তিন থেকে চারটি সুইমিং পুল ভরানো সম্ভব। তথ্য অনুযায়ী, উত্তোলিত স্বর্ণের বেশির ভাগই তোলা হয়েছে ১৯৫০ সালের পর, অর্থাৎ আধুনিক শিল্পায়ন ও প্রযুক্তির বিকাশের সময়েই স্বর্ণ উত্তোলনের গতি সবচেয়ে বেশি ছিল। তবে এত স্বর্ণ উত্তোলনের পরও এর সীমিত সরবরাহ এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে দাম দীর্ঘমেয়াদে ঊর্ধ্বমুখী থাকার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) ধারণা করছে, ভূগর্ভস্থ মজুত থেকে আরও প্রায় ৬৪ হাজার টন স্বর্ণ উত্তোলন করা সম্ভব। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন খনি আবিষ্কার ও উত্তোলনের খরচ দিন দিন বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে স্বর্ণের সরবরাহকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে। যদিও কিছু পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, আগামী বছরগুলোতে স্বর্ণের সরবরাহ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারে, তবু ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে দামের ওপর চাপ কমবে—এমন আশা খুব কমই করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বর্ণের এই রেকর্ড দাম সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক দেশে গহনার বাজারে স্বর্ণের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আবার অন্যদিকে, যাঁরা স্বর্ণে বিনিয়োগ করেছেন, তাঁদের জন্য এটি বড় ধরনের লাভের সুযোগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে স্বর্ণ শুধু বিনিয়োগের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের এমন উত্থান স্থানীয় বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলার ছাড়ানো শুধু একটি অর্থনৈতিক ঘটনা নয়, বরং এটি বর্তমান বিশ্বের অস্থিরতার প্রতীক। যুদ্ধ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, বাণিজ্য দ্বন্দ্ব এবং মুদ্রানীতির অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়ে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। সেই শঙ্কাই তাদের স্বর্ণের মতো নিরাপদ সম্পদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই স্বর্ণের এই রেকর্ড দাম বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্সে ৫ হাজার ডলার ছাড়ানো স্বর্ণের দাম বিশ্ববাজারে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি যেমন বিনিয়োগকারীদের জন্য লাভের সুযোগ এনে দিয়েছে, তেমনি বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তার কথাও নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতির ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে, এই মূল্যবান ধাতুর দাম আরও কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত