প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ক্যানসার শব্দটি শুনলেই মানুষের মনে ভয় ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়। শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ক্যানসার হতে পারে, তবে তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হলেও হাড়ের ক্যানসার একটি গুরুতর ও জটিল রোগ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বোন ক্যানসার বলা হয়। এটি মূলত হাড়ের কোষে সৃষ্ট এক ধরনের ম্যালিগন্যান্ট টিউমার, যা ধীরে ধীরে হাড়ের স্বাভাবিক গঠন ও শক্তি নষ্ট করে দেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাত, পা বা পেলভিসের দীর্ঘ হাড় এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে এই ক্যানসার রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলেন, ক্যানসার এমন একটি অবস্থা, যেখানে শরীরের কোনো নির্দিষ্ট স্থানের কোষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। যখন এই অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধি হাড়ের ভেতরে বা হাড়ের মজ্জায় শুরু হয়, তখন সেটিই হাড়ের ক্যানসার হিসেবে পরিচিত। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বোন ক্যানসার মূলত একটি ম্যালিগন্যান্ট টিউমার, যা স্বাভাবিক হাড়ের টিস্যুকে ধ্বংস করে দেয়। এই রোগ শিশু, কিশোর ও বয়স্ক—সব বয়সেই হতে পারে, তবে শিশু ও প্রবীণদের মধ্যে এর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। কেন বা কী কারণে হাড়ের ক্যানসার হয়, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট ও চূড়ান্ত কোনো কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞান নিশ্চিত করতে পারেনি।
চিকিৎসা শাস্ত্রে হাড়ের ক্যানসারকে সাধারণত দুইটি বড় শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। একটি হলো সারকোমা, যা হাড়, পেশি, কারটিলেজ এবং রক্তনালির মতো সংযোগকারী টিস্যুর ক্যানসার। অন্যটি হলো লিউকেমিয়া, যা হাড়ের মজ্জার ক্যানসার এবং রক্তকোষ তৈরির প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। এই দুই ধরনের ক্যানসারের উপসর্গ, বিস্তার এবং চিকিৎসা পদ্ধতিতেও পার্থক্য রয়েছে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই প্রাথমিক লক্ষণগুলো অনেক সময় সাধারণ সমস্যার মতো মনে হওয়ায় রোগীরা বিষয়টি অবহেলা করেন, যা পরবর্তীতে বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাড়ের ক্যানসারের সবচেয়ে সাধারণ এবং স্পষ্ট উপসর্গ হলো ব্যথা। এই ব্যথা সাধারণত হাড়ের গভীর অংশে অনুভূত হয় এবং শুরুতে হালকা থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তীব্র আকার ধারণ করে। অনেক রোগী প্রথমে এটিকে সাধারণ ব্যথা বা আঘাতজনিত সমস্যা বলে ধরে নেন। কিন্তু ধীরে ধীরে এই ব্যথা এতটাই অসহনীয় হয়ে ওঠে যে দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হয়, এমনকি রাতে ঘুমাতেও সমস্যা দেখা দেয়। দীর্ঘদিন ধরে কোনো নির্দিষ্ট হাড়ে ব্যথা থাকলে এবং বিশ্রাম নিলেও যদি তা না কমে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন বলে চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন।
হাড়ের ক্যানসারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো আক্রান্ত স্থানে ফোলা বা গাঁট তৈরি হওয়া। অনেক সময় এই ফোলা অংশটি পুঁজ জমার মতো মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এটি হাড়ের ভেতরে বা আশপাশে টিউমার বৃদ্ধির ফল। ফোলার সঙ্গে সঙ্গে ওই জায়গায় চাপ দিলে ব্যথা অনুভূত হতে পারে এবং ত্বক লালচে বা উষ্ণ হয়ে উঠতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এই ফোলা ধীরে ধীরে বড় হয়, আবার কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে হঠাৎ করেই চোখে পড়ার মতো আকার ধারণ করে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা আরও জানান, হাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হলে হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে অল্প আঘাতেই বা কখনো কোনো কারণ ছাড়াই হাড় ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। এটিকে প্যাথলজিক্যাল ফ্র্যাকচার বলা হয়। বিশেষ করে যাঁদের বয়স বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় বারবার হাড় ভাঙার ঘটনা ঘটলে সেটিকে সাধারণ দুর্বলতা ভেবে এড়িয়ে না গিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
হাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীরা ধীরে ধীরে চলাফেরা ও নড়াচড়ায় অসুবিধা অনুভব করেন। হাঁটতে গেলে ব্যথা, বসতে বা উঠতে সমস্যা, কিংবা হাত-পা স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করতে না পারার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এসব সমস্যা রোগীর কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং মানসিক চাপও বাড়িয়ে তোলে। অনেক সময় রোগী নিজেই বুঝতে পারেন না যে এই অস্বস্তির পেছনে একটি মারাত্মক রোগ লুকিয়ে থাকতে পারে।
শুধু স্থানীয় উপসর্গই নয়, হাড়ের ক্যানসারে কিছু সাধারণ শারীরিক লক্ষণও দেখা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া, সার্বক্ষণিক ক্লান্তি বা ফ্যাটিগ, দুর্বলতা, আলস্যভাব এবং ঘন ঘন জ্বর। অনেক রোগী রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়ায় ভোগেন, যার ফলে শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা শরীর অবসন্ন লাগার মতো সমস্যা দেখা দেয়। চিকিৎসকেরা বলেন, শরীরের হাড়গুলোর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বা গঠনগত পরিবর্তনও এই রোগ শনাক্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাড়ের ক্যানসার সবসময় হাড় থেকেই শুরু হবে—এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে শরীরের অন্য অঙ্গের ক্যানসার থেকে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। যেমন ফুসফুস, স্তন বা প্রোস্টেট গ্রন্থির ক্যানসার কোষ রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে হাড়ে ছড়িয়ে পড়ে সেকেন্ডারি বোন ক্যানসার তৈরি করতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে রোগীর পূর্বে ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে হাড়ে ব্যথা বা অন্যান্য উপসর্গকে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
চিকিৎসকরা মনে করেন, হাড়ের ক্যানসারের ক্ষেত্রে সময়মতো সচেতনতা ও প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় মানুষ ব্যথা বা দুর্বলতাকে বয়সজনিত সমস্যা বা সাধারণ অসুস্থতা ভেবে অবহেলা করেন। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, অস্বাভাবিক ফোলা, হাড় ভাঙা কিংবা হঠাৎ ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে হাড়ের ক্যানসারের চিকিৎসা সম্ভব হলেও এর জন্য প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ। চিকিৎসার ধরন রোগের ধরণ, বিস্তার ও রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তাই উপসর্গগুলোকে অবহেলা না করে সচেতন হওয়াই হতে পারে জীবন বাঁচানোর প্রথম ধাপ।
সচেতনতা, সময়মতো পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ—এই তিনটি বিষয় মেনে চললে হাড়ের ক্যানসারের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। শরীরের ভাষা বোঝার চেষ্টা করা এবং অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন চোখে পড়লে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি।