ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের গোপন অবস্থান

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৩ বার

প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অবস্থান। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত একটি গোপন বৈঠকে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান যে বার্তা দিয়েছেন, তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো অঞ্চলের কূটনৈতিক সমীকরণকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যদি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকেন, তাহলে তেহরান সরকার আরও উৎসাহিত ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে—এমন স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি।

মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় সময় শুক্রবার ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বন্ধ দরজার বৈঠকে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইরান ইস্যুতে রিয়াদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। বৈঠকে উপস্থিত সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রিন্স খালিদ মনে করেন, এই মুহূর্তে ইরানের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নিলে দেশটির সরকার আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে আরও জটিল রূপ নিতে পারে।

তবে সৌদি আরবের অবস্থান যে একমুখী বা সরল, তা নয়। একই বৈঠকে প্রিন্স খালিদ এটিও পরিষ্কার করে বলেন, সুনির্দিষ্ট কৌশল ও লক্ষ্য নির্ধারণ ছাড়া ইরানে বোমা হামলা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলতে পারে। অর্থাৎ, সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিলেও, তিনি পরিকল্পনাহীন বা হঠকারী হামলার বিপক্ষে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। দ্য টাইমস অব ইসরাইলকে দেওয়া এক সূত্রের তথ্যমতে, সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানিয়েছেন—ইরান ইস্যুতে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্পষ্ট উদ্দেশ্য, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল এবং সম্ভাব্য পরিণতি ভালোভাবে বিবেচনা করার জন্য।

এই অবস্থান সৌদি আরবের আগের নীতির তুলনায় কিছুটা ভিন্ন বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। অতীতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লেও, সৌদি আরব সাধারণত প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার বিষয়ে তুলনামূলক সতর্ক ছিল। বিশেষ করে আঞ্চলিক অস্থিরতা, জ্বালানি বাজারে প্রভাব এবং নিজেদের নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে রিয়াদ অনেক সময় সংযত কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহার করত। কিন্তু সাম্প্রতিক গোপন বৈঠকে দেওয়া বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব সৌদি নেতৃত্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

একই দিনে উপসাগরীয় অঞ্চলের আরেক শীর্ষ কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা যেমন ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তেমনি হামলা না হলে ইরান আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। এই দ্বিমুখী ঝুঁকির কথাই এখন মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির মূল আলোচ্য বিষয়। একদিকে যুদ্ধের আশঙ্কা, অন্যদিকে নিষ্ক্রিয়তার ফলে শক্তির ভারসাম্য বদলে যাওয়ার ভয়।

এ প্রসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মন্তব্য করেছেন ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি। তিনি লেখেন, সৌদি কর্মকর্তারা বিষয়টি ভালোভাবেই বোঝেন। তার এই সংক্ষিপ্ত মন্তব্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অনেকের মতে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে ইসরাইল ও সৌদি আরব—দু’দেশই ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছে, যদিও প্রকাশ্যে তাদের কূটনৈতিক ভাষা ভিন্ন হতে পারে।

অন্যদিকে, অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সম্প্রতি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর হামলার জন্য নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। এই অবস্থান আবারও প্রমাণ করে যে, রিয়াদ একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও, সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে তারা এখনো অনিচ্ছুক। সৌদি কর্মকর্তারা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য উভয় ক্ষেত্রেই কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষেই নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের এই দ্বৈত বার্তাই সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বড় প্রভাব ফেলছে। একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের আহ্বান, অন্যদিকে যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে সতর্কতা—এই ভারসাম্যপূর্ণ চাপ হয়তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত রাখছে। প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, রিয়াদের এই সতর্ক কূটনৈতিক অবস্থানই ইরানে সম্ভাব্য হামলার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে ট্রাম্প প্রশাসনকে প্রভাবিত করেছে।

শনিবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্পের কাছেও উঠে আসে ইরান প্রসঙ্গ। শুরুতে তিনি প্রশ্নটি এড়িয়ে যেতে চাইলেও পরে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে ব্যাপক সামরিক সম্পদ জোরদার করেছে। একই সঙ্গে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, তেহরান এমন বিষয়ে আলোচনায় বসবে যা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মন্তব্য প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, কেউ কেউ মনে করতে পারে হামলা না হলে ইরান আরও উৎসাহিত হবে, আবার কেউ কেউ তা মনে করে না।

এই বক্তব্য ট্রাম্পের কৌশলগত দ্বিধারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। একদিকে তিনি শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করতে চান, অন্যদিকে সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি এড়িয়ে যেতে চাইছেন। মধ্যপ্রাচ্যের জটিল বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্ত যে কতটা কঠিন, তা স্পষ্ট।

সব মিলিয়ে, ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর গোপন বৈঠক ইরান ইস্যুতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নাকি কূটনৈতিক চাপ—এই দ্বন্দ্বের মীমাংসা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক মহলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com