প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় হাইকোর্টে খালাস পাওয়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত আপিলের শুনানির জন্য আগামী বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেছেন আপিল বিভাগ। এই মামলাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত ও আলোচিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ এ বিষয়ে আদেশ দেন। বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা এদিন আদালতে উপস্থিত থেকে মামলাটিকে দ্রুত শুনানির অনুরোধ জানান। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই ১৭ জুলাই শুনানির তারিখ নির্ধারিত হয়।
আদালতে বিএনপির পক্ষ থেকে অংশ নেন দলটির শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী ও স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলসহ আরও অনেকে। তাঁরা আদালতে যুক্তি তুলে ধরেন যে, মামলার খালাসপ্রাপ্ত আসামিদের বিরুদ্ধে আবার শুনানি শুরুর উদ্যোগ সংবিধান ও ফৌজদারি বিচারনীতির আলোকে পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত হন এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা গুরুতর আহত হন। এই নৃশংস হামলার তদন্তে উঠে আসে রাষ্ট্রীয় মদদে একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্র।
মামলাটির বিচারিক আদালত ২০১৮ সালে রায় দেন। এতে লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তারেক রহমানসহ আরও ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এছাড়া পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ ১১ কর্মকর্তাসহ মোট ৪৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।
তবে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ আসামিদের আপিল মঞ্জুর করে এবং একইসঙ্গে ডেথ রেফারেন্স খারিজ করে দেন। ফলে মামলার সকল আসামি—চাই তারা আপিল করুক বা না করুক—খালাস পেয়ে যান।
এই রায়ের পর ব্যাপক বিতর্ক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। অনেকেই হাইকোর্টের রায়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং উচ্চতর আদালতে আপিলের দাবি জানান। সরকারপক্ষও এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার প্রস্তুতি নেয়।
সেই আপিলের শুনানিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও উত্তেজনা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই মামলার শুনানির ফলাফল শুধু বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নেই নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
এই প্রেক্ষাপটে আগামী বৃহস্পতিবারের শুনানি শুধু একটি মামলার বিচার নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার এক বড় পরীক্ষা। এতে রাজনৈতিক দল, আইনজ্ঞ সমাজ, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাসহ গোটা জাতির নজর আপিল বিভাগের দিকেই রয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, ২১ আগস্টের মতো ভয়াবহ মানবতা-বিরোধী হামলার বিচার যদি শেষ পর্যন্ত মীমাংসিত না হয়, তবে তা বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ও আইনশৃঙ্খলার ভিত্তিকে দুর্বল করে দেবে। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, খালাসপ্রাপ্ত আসামিদের বিরুদ্ধে আপিল এক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উদ্যোগ।
শেষ পর্যন্ত আইন এবং প্রমাণের ভিত্তিতেই হবে এই মামলার রায়—এমনটি প্রত্যাশা করে দেশবাসী। আপিল বিভাগ এই মামলায় কোন দিকনির্দেশনা দেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।