প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে সংঘটিত কথিত গুম, হত্যা ও বিচারবহির্ভূত মৃত্যুর ঘটনায় বহুল আলোচিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিচার শুরু হয়েছে। আজ রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। একই সঙ্গে মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে জবানবন্দি দিতে আসেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া, যা মামলাটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে বলে মনে করছেন আইন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই মামলার বিচার পরিচালনা করছে। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। আজকের কার্যদিবসে প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের পাশাপাশি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণের কার্যক্রম শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, এ মামলায় ধারাবাহিকভাবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্য উপস্থাপন করা হবে, যাদের বয়ান মামলার অভিযোগসমূহের সত্যতা যাচাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এর আগে গত ১৪ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল জিয়াউল আহসানের অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন এবং বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। সেই আদেশের পর থেকেই মামলাটি ঘিরে জনমনে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগগুলো এবার আনুষ্ঠানিক বিচারের মুখোমুখি হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মোট তিনটি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে র্যাব সদর দপ্তর থেকে অবৈধভাবে আটক সজলসহ তিনজন বন্দিকে জিয়াউল আহসান ও তার নেতৃত্বাধীন একটি দল গাজীপুরের দিকে নিয়ে যায়। অভিযোগে বলা হয়, ঢাকা বাইপাস সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাড়ি থামিয়ে পর্যায়ক্রমে বন্দিদের চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পুরো প্রক্রিয়ায় জিয়াউল আহসান সরাসরি নেতৃত্ব ও তত্ত্বাবধান করেছেন বলে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
দ্বিতীয় অভিযোগে উঠে এসেছে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী এলাকা ও বলেশ্বর নদীর মোহনাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত একাধিক হত্যাকাণ্ডের বিবরণ। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব এলাকা ছিল জিয়াউল আহসান পরিচালিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম ‘হটস্পট’। গভীর রাতে বন্দিদের ট্রলার বা নৌকায় করে নদীর মাঝখানে নিয়ে যাওয়া হতো। এরপর মাথা কিংবা বুকে বালিশ চেপে গুলি করে হত্যা করা হতো। পরে লাশের পেটে কেটে সিমেন্টের ব্লক বেঁধে পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হতো, যাতে মরদেহ আর কখনো ভেসে না ওঠে। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, এই পদ্ধতিকে অভ্যন্তরীণভাবে ‘গেস্টাপো’ বা ‘গলফ’ কোড নামে পরিচালনা করা হতো। এভাবে সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুল ইসলাম মল্লিক ও আলকাছ মল্লিকসহ কমপক্ষে ৫০ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
তৃতীয় অভিযোগে তথাকথিত বনদস্যু দমনের নামে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত হত্যা অভিযানের কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্বে আটক ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের বনদস্যু হিসেবে সাজিয়ে গভীর রাতে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হতো এবং পরে সেগুলোকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হিসেবে প্রচার করা হতো। এসব অভিযানে র্যাবের বাছাই করা সদস্যরা অংশ নিতেন এবং বহু ক্ষেত্রে জিয়াউল আহসান নিজেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পুরো অভিযান তদারকি করতেন বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় ‘অপারেশন নিশানখালী’, ‘অপারেশন মরা ভোলা’ ও ‘অপারেশন কটকা’ নামে তিনটি অভিযানে অন্তত ৫০ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করেছে।
আজকের শুনানিতে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়ার উপস্থিতি মামলাটিকে বিশেষ গুরুত্ব এনে দিয়েছে। তার সাক্ষ্য জিয়াউল আহসানের সামরিক দায়িত্বকাল, কমান্ড কাঠামো এবং অভিযুক্ত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন সাবেক সেনাপ্রধানের সাক্ষ্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে নজিরবিহীন গুরুত্ব বহন করতে পারে।
মামলাটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র আলোচনা চলছে। অনেকে মনে করছেন, এই বিচার শুধু একজন ব্যক্তির বিচার নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ওঠা গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতির জবাবদিহির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় বছরের পর বছর কাটিয়েছেন। এই বিচার প্রক্রিয়া তাদের সেই অপেক্ষার অবসান ঘটাতে পারে বলে তারা আশাবাদী।
রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, মামলার বিচার কার্যক্রম স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সাক্ষ্যগ্রহণ, প্রমাণ উপস্থাপন এবং আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, আগামী দিনে ধারাবাহিক শুনানির মাধ্যমে মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হবে।
সব মিলিয়ে, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হওয়া বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই বিচার কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগোয়, তার দিকেই এখন তাকিয়ে আছে দেশবাসী।