জুনের শুরুতেই রেমিট্যান্সে বড় স্বস্তি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬
  • ২৭ বার

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলতি জুন মাসের শুরুতেই দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তির বার্তা দিয়েছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। মাসের প্রথম ১০ দিনে দেশে এসেছে ১২০ কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় বিপুল অঙ্কে। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে দেশে এসেছে ১২ কোটি ৩ লাখ ডলারের বেশি রেমিট্যান্স। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, আমদানি ব্যয়, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা ও টাকার মান নিয়ে আলোচনার মধ্যে এ প্রবাহ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শুক্রবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৯৫ কোটি ৬১ লাখ ৯০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জুনের প্রথম ১০ দিনে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বেড়েছে বড় ব্যবধানে। এই বৃদ্ধি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিদেশে থাকা লাখো বাংলাদেশির ঘাম, পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ ও পরিবারের প্রতি গভীর ভালোবাসা।

রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় ভরসা। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের নানা দেশে কাজ করেন বাংলাদেশিরা। কেউ নির্মাণ শ্রমিক, কেউ গাড়িচালক, কেউ পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ আবার পেশাজীবী। প্রতিদিন তারা কঠিন বাস্তবতার ভেতর দিয়ে আয় করেন। তারপর সেই আয়ের একটি বড় অংশ পাঠান দেশে থাকা বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান, ভাইবোন বা পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে। তাই রেমিট্যান্সের প্রতিটি ডলার শুধু অর্থ নয়, বরং একটি পরিবারের আশা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।

চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ১০ জুন পর্যন্ত দেশে এসেছে ৩ হাজার ৩৯৫ কোটি ৯৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, বছর ব্যবধানে এ প্রবাহ বেড়েছে ১৯ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বৈধ পথে টাকা পাঠানোর প্রবণতা বাড়া, ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনের সুবিধা, বিনিময় হার এবং উৎসব ঘিরে পরিবারের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী হয়েছে। তবে তারা এটিও বলেন, ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে প্রবাসীদের জন্য সেবা সহজ করতে হবে। একই সঙ্গে হুন্ডি বন্ধে কঠোর নজরদারি জরুরি।

গত কয়েক মাসের রেমিট্যান্স প্রবাহও বেশ শক্তিশালী ছিল। মে মাসে দেশে আসে ৩৪২ কোটি ৫০ লাখ ৩০ হাজার ডলার। এটি দেশের ইতিহাসে এক মাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়। এর আগে মার্চ মাসে আসে ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার ডলার। সেটি এখন পর্যন্ত এক মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্সের রেকর্ড। এপ্রিলে দেশে আসে ৩১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। ফেব্রুয়ারিতে আসে ৩০২ কোটি ৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার। জানুয়ারিতে আসে ৩১৭ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার। অর্থাৎ চলতি বছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

গত বছরের শেষ দিকেও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ভালো ছিল। ডিসেম্বরে দেশে আসে ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। নভেম্বরে আসে ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার ডলার। অক্টোবরে আসে ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার ডলার। সেপ্টেম্বরে আসে ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার। আগস্টে আসে ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার। জুলাই মাসে আসে ২৪৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এই ধারাবাহিক প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের প্রভাব সরাসরি দেখা যায় গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত। একটি পরিবার রেমিট্যান্সের টাকায় সন্তানের পড়াশোনা চালায়। কেউ বাড়ি মেরামত করে। কেউ জমি কেনে। কেউ ছোট ব্যবসা শুরু করে। আবার অনেক পরিবার চিকিৎসা, ঋণ পরিশোধ বা দৈনন্দিন খরচের জন্য এই টাকার ওপর নির্ভর করে। তাই রেমিট্যান্স বাড়লে শুধু ব্যাংকের হিসাবে ডলার বাড়ে না। দেশের ভেতরে ক্রয়ক্ষমতা, বাজারে চাহিদা এবং পারিবারিক স্থিতিও বাড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসী আয়ের বড় অংশ বৈধ চ্যানেলে আসা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স এলে তা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সহায়তা করে। আমদানি দায় মেটানো, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্য কেনা, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনে এই ডলার কাজে লাগে। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়া মানে শুধু ব্যক্তিগত আয়ের উন্নতি নয়, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও শক্তিশালী সহায়তা।

তবে ভালো প্রবাহের মধ্যেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বহু প্রবাসী এখনো ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করতে আগ্রহী হন না। অনেকে দ্রুত টাকা পৌঁছানোর জন্য অনানুষ্ঠানিক পথ বেছে নেন। এতে পরিবার হয়তো দ্রুত টাকা পায়, কিন্তু দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সরকার ও ব্যাংকগুলোকে প্রবাসীদের কাছে সেবা আরও সহজ, দ্রুত এবং কম খরচের করতে হবে। মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন ট্রান্সফার এবং ব্যাংকের প্রবাসী সেবাকে আরও ব্যবহারবান্ধব করলে বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়তে পারে।

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স। সেটি ছিল দেশের ইতিহাসে কোনো নির্দিষ্ট অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের রেকর্ড। চলতি অর্থবছরের শেষ দিকে এসে যে প্রবাহ দেখা যাচ্ছে, তাতে নতুন রেকর্ডের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। তবে শেষ পর্যন্ত তা নির্ভর করবে জুনের বাকি দিনের প্রবাহ, বৈশ্বিক শ্রমবাজার, বিনিময় হার এবং প্রবাসীদের টাকা পাঠানোর আচরণের ওপর।

দেশের অর্থনীতিতে যখন নানা ধরনের চাপ আছে, তখন রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ আশার আলো দেখাচ্ছে। প্রবাসীরা দেশের বাইরে থাকলেও তাদের উপার্জন দেশের অর্থনীতির ভেতরে প্রাণ জোগায়। তাদের পাঠানো অর্থে চলে অসংখ্য পরিবার। এগিয়ে যায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা ও গ্রামীণ অর্থনীতি। তাই জুনের প্রথম ১০ দিনে ১২০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসা শুধু একটি অর্থনৈতিক খবর নয়। এটি দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশিদের নীরব অবদানের আরেকটি শক্ত প্রমাণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত