প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বকাপ ফুটবল আর শাকিরা যেন বহুদিনের এক পরিচিত গল্প। মাঠে বল গড়ানোর আগেই তার গান, নাচ আর ঝলমলে উপস্থিতি ফুটবল উৎসবকে অন্য মাত্রা দেয়। ২০১০ সালের ‘ওয়াকা ওয়াকা’ এখনো বিশ্বকাপের স্মৃতিতে আলাদা জায়গা করে আছে। সেই শাকিরাই আবার ফিরলেন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চে। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আসতেকা স্টেডিয়ামে নাইজেরিয়ান তারকা বার্না বয়কে সঙ্গে নিয়ে তিনি পরিবেশন করেন বিশ্বকাপের অফিশিয়াল গান ‘দাই দাই’। কিন্তু মঞ্চ মাতানোর পরও তাকে ঘিরে থামছে না আলোচনা, রহস্য আর বিতর্ক।
২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে এক নতুন ইতিহাস নিয়ে। প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা মিলিয়ে তিন দেশ আয়োজন করছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর। সেই আয়োজনের প্রথম বড় মঞ্চ ছিল মেক্সিকো সিটি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিল লাতিন সংস্কৃতি, সংগীত, নাচ, আলো আর বিশ্বকাপের উত্তেজনা। দর্শকে ভরা গ্যালারি, রঙিন আলো আর ফুটবলপ্রেমীদের গর্জনের মধ্যে শাকিরার প্রবেশ মুহূর্তেই অনুষ্ঠানকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে যায়।
শাকিরা মঞ্চে ওঠেন নেয়ন-হলুদ রঙের মেশ আউটফিট, ম্যাচিং গ্লাভস, সাদা শর্টস ও প্ল্যাটফর্ম স্নিকার্স পরে। চোখে ছিল বড় কালো সানগ্লাস। তার সঙ্গে ছিলেন বার্না বয়। দুই শিল্পীর পারফরম্যান্সে লাতিন পপ, আফ্রোবিটস আর বিশ্বকাপের উৎসব একসঙ্গে মিশে যায়। ‘দাই দাই’ গানটি আগেই ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে আলোচনায় এসেছিল। উদ্বোধনী মঞ্চে সেটি পরিবেশনের পর গানটি আরও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
তবে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগেই শাকিরাকে ঘিরে শুরু হয় নতুন আলোচনা। ব্যাকস্টেজের একটি ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে নেটদুনিয়ায়। ভিডিওতে দেখা যায়, পারফরম্যান্স শেষে শাকিরা ও তার নাচের দলকে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছিল। ঠিক তখনই নিজের ভাই আন্তোনিও মেবারাকের সঙ্গে হঠাৎ নাচতে শুরু করেন শাকিরা। নিরাপত্তারক্ষীরা তাদের এগিয়ে যেতে বললেও ভাই-বোনের আনন্দ যেন থামছিল না। মুহূর্তটি খুব ছোট হলেও তা ভক্তদের কাছে হয়ে ওঠে এক উষ্ণ মানবিক দৃশ্য।
অনেক ভক্ত শাকিরার এই স্বতঃস্ফূর্ত আচরণকে ভালোবাসা দিয়ে গ্রহণ করেছেন। তাদের মতে, এটাই আসল শাকিরা। মঞ্চের তারকা হয়েও তিনি নিজের আনন্দ লুকান না। কেউ লিখেছেন, বারানকিলার দুই সন্তান আসতেকার মাঠে নিজেদের মতো করে মুহূর্তটি উপভোগ করেছেন। আরেকজন লিখেছেন, শাকিরা সবসময় নিজের মতো থাকেন, এ কারণেই মানুষ তাকে ভালোবাসে। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই ভিডিওটি শেয়ার করে বলেছেন, তার এই সহজ রূপই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
কিন্তু সব আলোচনা এত সরল ছিল না। উদ্বোধনী মঞ্চে শাকিরার উপস্থিতি নিয়ে দ্রুত ছড়ায় এক অদ্ভুত দাবি। অনেক নেটিজেন বলতে থাকেন, মঞ্চে যিনি পারফর্ম করেছেন তিনি নাকি আসল শাকিরা নন। বরং তার মতো দেখতে কোনো ‘বডি ডাবল’ বা নকল রূপ ব্যবহার করা হয়েছে। এই দাবি প্রমাণহীন হলেও সামাজিক মাধ্যমে তা দ্রুত ছড়ায়। বিশেষ করে বড় সানগ্লাস, মুখের আংশিক ঢাকা লুক এবং দ্রুত ক্যামেরা কাটের কারণে কিছু দর্শকের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়।
একজন নেটিজেন প্রশ্ন তোলেন, তিনি কি একাই ভাবছেন যে মঞ্চের শিল্পীটি শাকিরা নন? আরেকজন লেখেন, শাকিরার চেহারা ও চলনে যেন কিছুটা অস্বাভাবিক লাগছিল। এ ধরনের মন্তব্যের পর ‘বডি ডাবল’ তত্ত্ব আরও ছড়িয়ে পড়ে। তবে এখন পর্যন্ত শাকিরা, তার টিম বা ফিফার পক্ষ থেকে এমন দাবির পক্ষে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই এই বিতর্ককে আপাতত সামাজিক মাধ্যমের জল্পনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে বড় অনুষ্ঠানের পর তারকাদের ঘিরে এমন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নতুন নয়। কখনো গানের লাইভ পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কখনো পোশাক, মুখের অভিব্যক্তি বা ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। শাকিরার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো বিশাল মঞ্চে প্রতিটি মুহূর্ত লাখো মানুষ দেখেন। ফলে ছোট কোনো দৃশ্যও বড় বিতর্কে পরিণত হতে সময় লাগে না।
এই বিতর্কে আরও আগুন জ্বালিয়েছে সম্প্রচার-সংক্রান্ত আলোচনা। যুক্তরাষ্ট্রের ফক্স টিভি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি লাইভ দেখায়নি বলে অনেক দর্শক অভিযোগ করেন। অন্যদিকে টেলিমুন্ডোতে শাকিরা ও বার্না বয়ের পারফরম্যান্স সরাসরি দেখা গেছে। ফক্স কেন পুরো অনুষ্ঠান সরাসরি দেখায়নি, তা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা না পাওয়ায় দর্শকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ওঠে। কেউ বলেন, সম্প্রচার পরিকল্পনার কারণে এমন হয়েছে। আবার কেউ মনে করেন, অনুষ্ঠান নিয়ে আগেই কোনো সীমাবদ্ধতা ছিল। তবে এ নিয়েও নিশ্চিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
শাকিরার বিশ্বকাপ-যোগ পুরনো। ২০০৬ বিশ্বকাপে তিনি ‘হিপস ডোন্ট লাই’ গানের বিশেষ সংস্করণ পরিবেশন করেন। ২০১০ সালে ‘ওয়াকা ওয়াকা’ তাকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় কণ্ঠে পরিণত করে। ২০১৪ সালেও তিনি বিশ্বকাপ মঞ্চে ছিলেন। ২০২৬ সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফিরে এসে তিনি আবারও দেখালেন, বিশ্বকাপের গান ও মঞ্চে তার অবস্থান এখনো শক্ত। বার্না বয়ের সঙ্গে তার জুটি বিশ্বকাপের বৈশ্বিক চরিত্রকেও তুলে ধরেছে। লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা এবং ফুটবলপ্রেমী বিশ্বের সাংস্কৃতিক মিলন যেন এই পারফরম্যান্সে দেখা গেছে।
তবে প্রশংসা ও বিতর্ক পাশাপাশি চলেছে। একদিকে দর্শকরা বলছেন, শাকিরা আবারও মঞ্চ দখল করেছেন। অন্যদিকে কিছু মানুষ এখনো প্রশ্ন তুলছেন তার উপস্থিতি নিয়ে। এই দ্বন্দ্বই প্রমাণ করে, শাকিরা এখনো বিশ্ব বিনোদনের সবচেয়ে আলোচিত তারকাদের একজন। তিনি মঞ্চে উঠলেই শুধু গান হয় না, তৈরি হয় আলোচনা। কখনো তা প্রশংসার, কখনো তা কৌতূহলের, কখনো আবার অদ্ভুত বিতর্কের।
শাকিরার পারফরম্যান্সের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার বয়স ও অবস্থান। ৪৯ বছর বয়সেও তিনি যেভাবে বড় মঞ্চে নাচ, গান ও শক্তি ধরে রেখেছেন, তা ভক্তদের মুগ্ধ করেছে। অনেকেই লিখেছেন, শাকিরা শুধু নস্টালজিয়া নন। তিনি এখনো বর্তমানের তারকা। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি নিজেকে নতুনভাবে তুলে ধরতে জানেন।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষ হলেও শাকিরাকে নিয়ে আলোচনা শেষ হয়নি। বরং গান, পোশাক, ভাইয়ের সঙ্গে নাচ, বডি ডাবল তত্ত্ব ও সম্প্রচার বিতর্ক মিলিয়ে তিনি এখন নেটদুনিয়ার বড় আলোচনার কেন্দ্রে। অনেকের কাছে এটি বিশ্বকাপের প্রথম দিনের সবচেয়ে বিনোদনমূলক গল্প। আবার অনেকের কাছে এটি সামাজিক মাধ্যমের অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণতার আরেক উদাহরণ।
শেষ পর্যন্ত যা স্পষ্ট, তা হলো শাকিরা আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের ছাপ রেখে গেছেন। বিতর্ক থাকুক বা না থাকুক, তার পারফরম্যান্স দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছে। আর সামাজিক মাধ্যমে যে ঝড় উঠেছে, সেটিও দেখিয়ে দিল, বিশ্বকাপের গান, মঞ্চ আর শাকিরার নাম একসঙ্গে এলেই আলোচনা থামানো কঠিন।