প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিএনপি সরকারের ঘোষিত প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আসবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, বাজেটে কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও সামগ্রিক রূপরেখা অর্থনীতির গভীর সংকট কাটানোর মতো শক্তিশালী নয়। তার মতে, রাজস্ব আদায়ের যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা বর্তমান বাস্তবতায় অর্জন করা কঠিন। আর এই লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে বাজেট বাস্তবায়ন, উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা এবং সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, প্রস্তাবিত বাজেট, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, দুর্নীতির ঝুঁকি এবং সুশাসনের অভাব নিয়ে কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। তার বক্তব্যে সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্পষ্ট অসন্তোষ ফুটে ওঠে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ৬ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। তার মতে, এটি বাস্তবতাবিবর্জিত। কারণ বাংলাদেশের ইতিহাসে এত বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় কখনো সহজ হয়নি। বর্তমান কর কাঠামো, রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতা এবং কর ফাঁকির বাস্তবতা বিবেচনা করলে এই লক্ষ্য অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। তিনি বলেন, শুধু বড় অঙ্ক ঘোষণা করলেই অর্থনীতি শক্তিশালী হয় না। সেই অর্থ সংগ্রহের বাস্তব উপায়ও থাকতে হয়।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সময় পার করছে, যখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম এখনো চাপ তৈরি করছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ায় পরিবার, ব্যবসা ও উৎপাদন খাতের ওপর নতুন চাপ পড়েছে। এর মধ্যে যদি বাজেট বাস্তবায়নের জন্য করের বোঝা বাড়ে, তাহলে তার প্রভাব সরাসরি জনগণের ওপর পড়বে। তাই বাজেটকে শুধু সংখ্যার খেলা হিসেবে না দেখে মানুষের জীবন দিয়ে বিচার করতে হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক এই বাজেটকে উচ্চাভিলাষী বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তারা আশা করেছিলেন এই বাজেটের মাধ্যমে অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার আসবে। বিশেষ করে রাজস্ব খাত, ব্যাংক খাত, ঋণখেলাপি নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি দমন, সরকারি ব্যয়ের জবাবদিহি এবং বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকর দিকনির্দেশনা থাকবে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটের রূপরেখায় সে ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই। ফলে এই বাজেট দিয়ে অর্থনৈতিক সংস্কার সম্ভব হবে না বলে মনে করেন তিনি।
তবে নাহিদ ইসলাম বাজেটের সব দিক নাকচ করেননি। তিনি বলেন, কিছু জায়গায় সরকার সৃজনশীলতার ইঙ্গিত দিয়েছে। কিছু পণ্যের কর কমানো হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এগুলো সাধারণভাবে ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে। কারণ বাংলাদেশে অনেক সময় বাজেটে ভালো কথা থাকে, কিন্তু বাস্তবায়নে দুর্বলতা দেখা যায়। ফলে বরাদ্দ বাড়লেও সাধারণ মানুষ তার সুফল পান না।
তিনি বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। কিন্তু শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং স্থানীয় সেবাকেন্দ্রগুলোতে সেই টাকা কীভাবে পৌঁছাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বরাদ্দ যদি দুর্নীতি, অপচয় বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সঠিক জায়গায় না যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ লাভবান হবে না। সামাজিক নিরাপত্তা খাতেও একই সমস্যা আছে। প্রকৃত দরিদ্র মানুষের বদলে যদি দলীয় প্রভাবশালীরা সুবিধা নেয়, তাহলে বাজেটের মানবিক লক্ষ্য ব্যর্থ হবে।
সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, এত কম সময়ের ব্যবধানে এভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নজিরবিহীন। তার মতে, বিদ্যুতের দাম বাড়লে শুধু বিদ্যুৎ বিল বাড়ে না। এর প্রভাব পড়ে উৎপাদন খরচে, পরিবহন খরচে, দোকানের খরচে এবং শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে। ফলে সাধারণ মানুষ আবারও মূল্যবৃদ্ধির চাপের মুখে পড়ে। তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখন মানুষের প্রধান উদ্বেগ। এই চাপ কমাতে না পারলে কোনো বাজেটই জনগণের কাছে স্বস্তির বার্তা দিতে পারবে না।
নাহিদ ইসলাম জানান, দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরার দাবিতে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে দেশের প্রতিটি বিভাগে কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, রাজনীতি শুধু সংসদ বা প্রেস কনফারেন্সে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের বাজারের কষ্ট, বিদ্যুৎ বিলের চাপ, চাকরির সংকট এবং আয় কমে যাওয়ার বাস্তবতার সঙ্গে রাজনীতিকে যুক্ত হতে হবে। তার মতে, সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন বাজেট শেষ পর্যন্ত কাগজে থাকে, জীবনে পৌঁছায় না।
বাজেটে সুশাসনের অভাব নিয়েও তিনি তীব্র সমালোচনা করেন। নাহিদ ইসলাম বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বাজেট কীভাবে দুর্নীতি বন্ধ করবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। বড় বাজেট মানেই বড় ব্যয়। আর বড় ব্যয়ের সঙ্গে বড় দুর্নীতির ঝুঁকিও তৈরি হয়। তাই বাজেটে জবাবদিহির কাঠামো না থাকলে উন্নয়ন ব্যয় নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠবে।
তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন কার্ড বিতরণ, খাল খনন কর্মসূচি এবং স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পে ক্ষমতাসীন দলের এমপিরা বরাদ্দ পাচ্ছেন, কিন্তু বিরোধীদলীয় এমপিরা একই সুযোগ পাচ্ছেন না। তার মতে, এটি বাজেট ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়। একটি রাষ্ট্রের বাজেট কোনো দলের সম্পদ নয়। এটি জনগণের করের টাকা। তাই এই টাকা বণ্টনে দলীয় পরিচয় নয়, মানুষের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিতে হবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বাজেটে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপের স্পষ্ট ঘোষণা নেই। অথচ দেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ, অনিয়ম ও আস্থাহীনতায় ভুগছে। তিনি মনে করেন, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা না ফিরলে অর্থনীতির ভিত দুর্বলই থাকবে। নতুন বাজেট যদি ব্যাংক খাতের দায় এড়িয়ে যায়, তাহলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন খাতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তার বক্তব্যে সরকারের প্রতি একটি সতর্কবার্তাও ছিল। তিনি বলেন, বাজেটের ভাষা সুন্দর হতে পারে। কিন্তু জনগণ এখন ফল দেখতে চায়। করের টাকা কোথায় যাবে, কারা সুবিধা পাবে, দুর্নীতি কীভাবে রোধ হবে, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং মূল্যস্ফীতি কীভাবে কমবে, এসব প্রশ্নের জবাব না থাকলে বাজেট নিয়ে মানুষের আস্থা তৈরি হবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য নতুন বাজেট ঘিরে বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে। সরকার বাজেটকে অর্থনৈতিক স্থিতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথ হিসেবে তুলে ধরলেও বিরোধী পক্ষ রাজস্ব লক্ষ্য, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং দুর্নীতির ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ফলে বাজেট আলোচনা এখন শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়। এটি রাজনৈতিক বিতর্কেরও বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সামনে নাহিদ ইসলাম যে বার্তা দিয়েছেন, তার মূল কথা হলো, বড় বাজেট নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত বাজেট। তার মতে, অর্থনৈতিক সংস্কার বলতে শুধু নতুন কর, বড় ব্যয় বা বড় প্রকল্প বোঝায় না। সংস্কার মানে হলো দুর্নীতি কমানো, জবাবদিহি বাড়ানো, রাজস্ব ব্যবস্থাকে ন্যায্য করা, ব্যাংক খাতকে শৃঙ্খলায় আনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কমানো। তিনি মনে করেন, প্রস্তাবিত বাজেটে সেই শক্ত বার্তা অনুপস্থিত।
শেষ পর্যন্ত এই বাজেট সংসদে আলোচনা, সংশোধন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে। সরকার হয়তো এটিকে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার বাজেট বলবে। বিরোধী দলগুলো বলবে, এটি বাস্তবতা থেকে দূরে। তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন আরও সহজ। এই বাজেট কি বাজারের দাম কমাবে? বিদ্যুৎ বিলের চাপ কমাবে? কাজের সুযোগ বাড়াবে? দুর্নীতি কমাবে? নাহিদ ইসলামের বক্তব্য সেই প্রশ্নগুলোকেই সামনে নিয়ে এসেছে।