সর্বশেষ :
প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবাসী কল্যাণ খাতে বরাদ্দ কমায় উদ্বেগ তামাকমুক্ত বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে বাধা হতে পারে প্রস্তাবিত বাজেট: বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ নতুন চেয়ারম্যান ও এমডি নিয়োগে গতি ফিরবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল নয়, লাইসেন্স বাতিল হয়েছে প্যাথলজি সেন্টারের: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্যাখ্যা খুলনায় গুলিতে নিহত বিএনপি নেতা ঢাকাইয়া রফিক, এলাকায় চাঞ্চল্য বাজেটে ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতার ঝুঁকি, সরকারের পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন জামায়াতের রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারে জেলা কমিটি বাজেটে সংস্কার দেখছেন না নাহিদ ইসলাম দেশকে সম্মানে ফেরানোর অঙ্গীকার মঈন খানের চলে গেলেন ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী ব্রিতো

রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারে জেলা কমিটি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬
  • ৪ বার

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজনৈতিক কারণে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়ায় নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে জেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করে সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সরকারের এই পদক্ষেপে ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে দায়ের হওয়া রাজনৈতিক মামলাগুলো পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হলো।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন-১ শাখা থেকে জারি করা সংশোধিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক কারণে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করতে জেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মতির পর এই কমিটি গঠন করা হয়। প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোরশেদ চৌধুরী।

নতুন প্রজ্ঞাপনে মামলার আবেদন, যাচাই, মতামত গ্রহণ এবং সুপারিশ পাঠানোর নির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া কিছুটা কাঠামোবদ্ধ হলো। আগে অনেক সময় রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার নিয়ে অভিযোগ, অস্পষ্টতা ও দীর্ঘসূত্রতা দেখা যেত। এবার জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও প্রসিকিউশন একসঙ্গে বসে বিষয়টি যাচাই করবে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, জেলা পর্যায়ের কমিটির সভাপতি থাকবেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। কমিটির সদস্য হিসেবে থাকবেন পুলিশ সুপার। মহানগর এলাকায় এ দায়িত্বে থাকবেন একজন ডেপুটি কমিশনার। কমিটিতে পাবলিক প্রসিকিউটর বা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটরও থাকবেন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

এই কমিটির মূল কাজ হবে আবেদন যাচাই করে দেখা। কোনো মামলা রাজনৈতিক কারণে বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে হয়রানির জন্য দায়ের করা হয়েছে কি না, সেটি তারা বিবেচনা করবে। যদি কমিটির কাছে মনে হয় মামলাটি হয়রানিমূলক, তাহলে তারা মামলা প্রত্যাহারের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠাবে। তবে কমিটি নিজে মামলা প্রত্যাহার করবে না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হবে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আসামি বা তার নিকটাত্মীয়রা সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করতে পারবেন। আবেদনের সঙ্গে মামলার দলিলপত্রের আইনজীবী কর্তৃক সত্যায়িত ফটোকপি জমা দিতে হবে। অর্থাৎ শুধু মৌখিক দাবি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো মামলা বিবেচনায় নেওয়া হবে না। আবেদনকারীকে প্রাথমিক কাগজপত্র দিতে হবে।

আবেদন পাওয়ার পর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সাত কর্মদিবসের মধ্যে তা পাবলিক প্রসিকিউটরের মতামতের জন্য পাঠাবেন। পাবলিক প্রসিকিউটর ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে মতামত দেবেন। এরপর বিষয়টি জেলা কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হবে। আবেদন পাওয়ার ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে সুপারিশসহ প্রয়োজনীয় তথ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে।

সরকারি এই সময়সীমা সাধারণ আবেদনকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনৈতিক মামলা নিয়ে বহু মানুষ বছরের পর বছর আদালত, থানা ও প্রশাসনিক দপ্তরে ঘুরেছেন। কেউ জামিনে আছেন। কেউ বিচারাধীন মামলার কারণে চাকরি, ব্যবসা বা পাসপোর্টসংক্রান্ত সমস্যায় পড়েছেন। অনেক পরিবার দাবি করে, তাদের স্বজনদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিছিল, সভা বা বিরোধী মত দমনের অংশ হিসেবে মামলা দেওয়া হয়েছিল।

২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়কে এই উদ্যোগের আওতায় আনা হয়েছে। এই সময় বাংলাদেশে দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তেজনা, নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, বিরোধী দলের আন্দোলন, গ্রেপ্তার এবং মামলা নিয়ে বারবার বিতর্ক হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বহুবার অভিযোগ করেছে, তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও রাজনৈতিক মামলার ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।

তবে এই উদ্যোগ নিয়ে সতর্কতার জায়গাও আছে। রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের নামে প্রকৃত অপরাধ যেন আড়াল না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ কোনো মামলায় যদি হত্যা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, গুরুতর সহিংসতা বা জননিরাপত্তার প্রশ্ন থাকে, তাহলে তা শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বাতিল করা যায় না। তাই যাচাই প্রক্রিয়ায় নথি, সাক্ষ্য, অভিযোগের প্রকৃতি এবং মামলার প্রেক্ষাপট ভালোভাবে দেখা দরকার।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হতে পারে। তবে সেটি হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায়ভিত্তিক এবং দলনিরপেক্ষ। কোনো দল ক্ষমতায় আছে, আর কোনো দল বিরোধী দলে আছে, সেই বিবেচনায় মামলা যাচাই করলে নতুন বিতর্ক তৈরি হবে। তাই জেলা কমিটির কাজের ওপর জনগণের আস্থা গড়তে হলে প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি থাকতে হবে।

এই প্রজ্ঞাপনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জারি করা পূর্বের পরিপত্র বাতিল করা হয়েছে। নতুন সংশোধিত প্রজ্ঞাপন অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে। এর অর্থ, এখন থেকে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের আবেদন ও সুপারিশ নতুন নিয়মেই চলবে।

সরকারের এই পদক্ষেপ অনেকের কাছে স্বস্তির খবর হতে পারে। বিশেষ করে যারা দাবি করেন, তারা রাজনৈতিক কারণে মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার শিকার হয়েছেন, তাদের জন্য এটি নতুন সুযোগ। তবে আবেদন করলেই মামলা প্রত্যাহার হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। জেলা কমিটি যাচাই করবে। পাবলিক প্রসিকিউটরের মতামত নেওয়া হবে। এরপর সুপারিশ যাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।

একটি মামলার পেছনে থাকে মানুষের জীবন, পরিবার, সময় এবং সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন। রাজনৈতিক মামলায় অভিযুক্ত অনেকে বছরের পর বছর আদালতে হাজিরা দেন। অনেকের পরিবার আর্থিক চাপের মুখে পড়ে। কেউ চাকরি হারান। কেউ ব্যবসা চালাতে পারেন না। আবার অন্যদিকে, ভুক্তভোগী পক্ষও ন্যায়বিচার চায়। তাই মামলার প্রত্যাহার প্রক্রিয়ায় মানবিকতা যেমন দরকার, তেমনি দরকার আইনের প্রতি শ্রদ্ধা।

এই উদ্যোগ সফল করতে হলে জেলা কমিটিগুলোর কাজ দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ হতে হবে। আবেদনকারীদেরও সঠিক কাগজপত্র জমা দিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব থাকবে বিষয়টিকে শুধু দলীয় সুবিধা হিসেবে না দেখা। কারণ হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার ন্যায়বিচারের অংশ হতে পারে, কিন্তু অপরাধ লুকানোর পথ হতে পারে না।

সব মিলিয়ে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারে জেলা কমিটি গঠনের প্রজ্ঞাপন দেশের বিচার ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয়, এই প্রক্রিয়া কত দ্রুত কার্যকর হয় এবং প্রকৃত ভুক্তভোগীরা কতটা সুফল পান। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই। রাজনৈতিক কারণে কেউ যেন মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার না হন। আবার সত্যিকারের অপরাধও যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে না যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত