প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে ‘বিশাল ঘাটতি ও ঋণনির্ভর’ আখ্যা দিয়ে সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতারা বলেছেন, বাজেটে রাজস্ব আহরণের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার চেয়ে ঋণ গ্রহণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেখা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে অর্থনীতির জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে তারা দাবি করেছেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজেটে আরও কার্যকর পদক্ষেপ থাকা প্রয়োজন ছিল।
রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন ও বাজেট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় দলটির নেতারা এ মন্তব্য করেন। তাদের মতে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি জনগণমুখী ও উৎপাদনমুখী বাজেট প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ও পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি অর্থায়নের উৎস নিয়েও বেশ কিছু প্রশ্ন থেকে গেছে।
জামায়াতের নেতারা বলেন, বাজেটে যে পরিমাণ ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে, তার তুলনায় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। অতীতে রাজস্ব আদায়ের যে চিত্র দেখা গেছে, তা বিবেচনায় নিলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে না। ফলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হতে পারে।
দলটির মতে, ঋণ নিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় হতে পারে, তবে ঋণের পরিমাণ যখন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পায়, তখন তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আর্থিক দায় তৈরি করে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধে সরকারের ব্যয় বাড়তে থাকলে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ বরাদ্দ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, বর্তমানে সাধারণ মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে রয়েছে। এই বাস্তবতায় বাজেটে খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
তারা দাবি করেন, বাজেটে ব্যবসা ও শিল্প খাতের জন্য কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মশক্তিকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করতে না পারলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে না।
জামায়াতের নেতারা আরও বলেন, কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করা প্রয়োজন। করের আওতা সম্প্রসারণের নামে যদি সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়, তাহলে ভোগব্যয় কমে যেতে পারে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাদের মতে, কর ফাঁকি রোধ, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে আয় বাড়ানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশের ব্যাংকিং খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিনিয়োগ পরিবেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে বাজেটের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। তারা আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশও মনে করেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক দেশই ঘাটতি বাজেট গ্রহণ করছে। তবে ঘাটতির পরিমাণ, ঋণের উৎস এবং সেই অর্থের ব্যবহার কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই মূল বিবেচ্য বিষয়। তাদের মতে, উন্নয়ন ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করা গেলে ঋণনির্ভরতার ঝুঁকি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে একটি বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। রাজস্ব বৃদ্ধি, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সরকারের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের মতে, বড় অর্থনীতির দেশগুলোতেও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনায় ঘাটতি বাজেট একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঋণ গ্রহণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। তারা আশা করছেন, চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাজেট বাস্তবায়ন আরও সহজ হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় বাজেট শুধু অর্থনৈতিক দলিল নয়; এটি রাজনৈতিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। ফলে সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাজেট নিয়ে ভিন্নমত থাকাই স্বাভাবিক। তবে এসব আলোচনা ও সমালোচনা বাজেট বাস্তবায়নকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করতে সহায়ক হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একদিকে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এ পরিস্থিতিতে বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে কতটা দক্ষতার সঙ্গে রাজস্ব সংগ্রহ করা যায়, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর।
সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটকে ঘাটতি ও ঋণনির্ভর বলে সমালোচনা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আরও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা প্রয়োজন। অন্যদিকে সরকার বাজেটকে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করছে। এখন বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক সূচকের পরিবর্তনই নির্ধারণ করবে কোন পক্ষের মূল্যায়ন বাস্তবতার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।