প্রকাশ: ১৫ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গন ও দক্ষিণ ভারতীয় বিনোদন জগৎ এক হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হলো রোববার (১৩ জুলাই)। সুইসাইড নোট লিখে আত্মহত্যা করলেন মডেল ও অভিনেত্রী স্যান র্যাচেল, যার প্রকৃত নাম ছিল শঙ্কর প্রিয়া। মাত্র ২৬ বছর বয়সে জীবনকে বিদায় জানালেন এই প্রতিভাবান ও সংগ্রামী শিল্পী। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ারের করুণ পরিসমাপ্তি হলো, যার ক্ষতি শোবিজ অঙ্গন সহজে ভুলবে না।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, র্যাচেল আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে একসঙ্গে একাধিক ওষুধ সেবন করেন পুদুচেরির কারামনিকুপ্পমে বাবার বাড়িতে অবস্থানকালে। প্রথমে তাকে একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে দ্রুত তাকে স্থানান্তর করা হয় বেসরকারি এক হাসপাতালে। শেষমেশ নেওয়া হয় জওহরলাল নেহরু ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চে, সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
মৃত্যুর পর উদ্ধার হওয়া সুইসাইড নোটে র্যাচেল কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেননি, তবে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে তিনি আর্থিক সংকটে ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে নানা ব্যক্তিগত মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, কিছুদিন আগেই র্যাচেল স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে দেন এবং বাবার কাছ থেকে কিছু টাকা ধার চেয়েছিলেন। তবে বাবা তা দিতে রাজি না হওয়ায় মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়েন তিনি।
সম্প্রতি বিয়ে করেছিলেন র্যাচেল। বিয়ের পর বাবার বাড়ি এসেই ঘটে এই মর্মান্তিক ঘটনা। পুলিশ বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করছে। বিশেষ করে তার দাম্পত্য সম্পর্ক মানসিক স্বাস্থ্যে কোনো প্রভাব ফেলেছিল কিনা—সেদিকেও দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে।
স্যান র্যাচেল ছিলেন এক অনন্য প্রতিভাধর মডেল যিনি প্রচলিত সৌন্দর্যের ধারণার বাইরে গিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ‘ব্ল্যাক বিউটি’ হিসেবে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এক সাহসী অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি। ভারতের হয়ে লন্ডন, ফ্রান্স ও জার্মানিতে আন্তর্জাতিক মডেলিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেন এবং ২০২০-২১ সালে মিস পুদুচেরি খেতাবের পাশাপাশি ব্ল্যাক বিউটি বিভাগে মিস ওয়ার্ল্ডের খেতাব অর্জন করেন। এছাড়া বহু নামী ফ্যাশন শো, বিজ্ঞাপন এবং সমাজ সচেতনতামূলক প্রচারণায় তার সক্রিয় উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।
অল্প বয়সেই মাকে হারানো র্যাচেল বাবার উৎসাহেই মডেলিংয়ে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু জীবনযুদ্ধে বহু বাধা পেরিয়ে উঠে আসা এই তরুণী অবশেষে থেমে গেলেন এক গভীর অন্ধকারের ডাকে।
পাকিস্তানের অভিনেত্রী হুমাইরা আসগরের আকস্মিক মৃত্যু এবং দক্ষিণ ভারতীয় কিংবদন্তি অভিনেত্রী বি সরোজা দেবীর মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই স্যান র্যাচেলের এই আত্মহননের ঘটনা বিনোদন জগতে নতুন করে বিষাদের ছায়া ফেলেছে।
এ মৃত্যু শুধু একটি প্রতিভার অবসান নয়, বরং আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য, আর্থিক নিরাপত্তা ও দাম্পত্য সম্পর্কের জটিল বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। শোকাহত ভক্তরা সামাজিক মাধ্যমে তাকে স্মরণ করে লিখছেন—‘তুমি শুধু একজন মডেল নও, তুমি ছিলে আশা, সংগ্রাম আর সৌন্দর্যের সংজ্ঞা।’
এই মৃত্যুর দায় হয়তো কোনো একটি ব্যক্তির নয়, বরং পুরো সমাজের, যারা একজন মেধাবী তরুণীকে তার স্বপ্নের পথচলায় একা ফেলে দিয়েছিল। এখন প্রয়োজন, এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে সমবেদনার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ। স্যান র্যাচেল আমাদের সেই দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে চিরতরে চলে গেলেন।