প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দিন খুলনায় এক মর্মান্তিক ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে গেছে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন। ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে এসে খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মহিবুজ্জামান কচি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে খুলনা আলিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল থেকেই তিনি কেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন। ভোটগ্রহণ শুরু হয় সকাল সাড়ে ৭টায়। কিছুক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। দ্রুত তাকে নিকটবর্তী হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও চিকিৎসকেরা জানান, পথেই তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় কেন্দ্রজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। উপস্থিত ভোটার ও দলীয় নেতাকর্মীরা স্তম্ভিত হয়ে পড়েন।
মহিবুজ্জামান কচি খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় রাজনীতিতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তার আকস্মিক মৃত্যুতে রাজনৈতিক সহকর্মী ও প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর নেতারাও শোক প্রকাশ করেছেন। অনেকেই বলেছেন, ভোটের মতো একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে এসে এমন মৃত্যু গভীরভাবে বেদনাদায়ক।
ঘটনার পরও কেন্দ্রটিতে কিছু সময়ের মধ্যে ভোটগ্রহণ স্বাভাবিক হয় বলে প্রশাসন জানিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং নির্বাচন কর্মকর্তারা ভোটারদের আশ্বস্ত করেন। নির্বাচন কমিশনের স্থানীয় কর্মকর্তারা বলেন, ঘটনাটি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যজনিত এবং এর সঙ্গে নির্বাচনী পরিবেশের কোনো সম্পর্ক নেই।
এদিকে সারা দেশে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামীর এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন বাতিল হওয়ায় ওই আসন বাদে ২৯৯ সংসদীয় আসনে ভোট হচ্ছে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত সার্বিক পরিবেশ স্বাভাবিক রয়েছে এবং বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে।
ভোটারদের উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানান, দল বেঁধে উৎসবমুখর পরিবেশে কেন্দ্রে এসে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে অনেক নাগরিক ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনও জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ভোটদানকে নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ভিন্নমত গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ এবং শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখে ভোট দেওয়া সবার দায়িত্ব। যেকোনো অনভিপ্রেত পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্বাচনী কর্মকর্তা, বিচারিক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে সক্রিয় রয়েছে বলে তিনি জানান।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এর পাশাপাশি ১ লাখেরও বেশি সেনাসদস্য মোতায়েন রয়েছে। দেশকে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় আনা হয়েছে বলে কমিশন জানিয়েছে। প্রশাসনের দাবি, ভোটাররা যেন ভয়-ভীতি ও শঙ্কাহীনভাবে কেন্দ্রে এসে ভোট দিতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য।
খুলনায় ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনা নির্বাচনের সামগ্রিক আবহে একটি মানবিক দিক তুলে ধরেছে। ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত কয়েকজন ভোটার বলেন, মহিবুজ্জামান কচিকে তারা দীর্ঘদিন ধরে চেনেন। একজন প্রবীণ ভোটার জানান, “তিনি ভোট দিতে এসেছিলেন, এটাই বড় কথা। এমন মৃত্যু খুব কষ্টের।” আরেকজন বলেন, “রাজনীতি আলাদা বিষয়, কিন্তু মানুষ হিসেবে তার জন্য আমাদের মায়া লাগছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কেবল সংখ্যার লড়াই নয়; এটি মানুষের অংশগ্রহণের এক বড় আয়োজন। সেই আয়োজনের দিন এমন একটি মৃত্যু সকলের মনে স্মরণ করিয়ে দেয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পেছনে আছে মানুষের জীবন, আবেগ ও প্রত্যাশা।
দিনব্যাপী ভোটগ্রহণ চলমান রয়েছে। কোথাও বড় ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে। তবে খুলনার ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে শোকের আবহ তৈরি করেছে। দলীয় নেতারা জানিয়েছেন, তারা পরিবারের পাশে থাকবেন এবং প্রয়াত নেতার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করবেন।
সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দিনটি যেমন উৎসবমুখর অংশগ্রহণের, তেমনি খুলনার এই মর্মান্তিক ঘটনা তাৎপর্যপূর্ণ এক মানবিক স্মারক হয়ে রইল। ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে এসে মহিবুজ্জামান কচির মৃত্যু রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে এক গভীর শোকের বার্তা দিয়ে গেল। এখন পুরো দেশের দৃষ্টি দিনের শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ ও গ্রহণযোগ্য ফলাফলের দিকে।