প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা যখন নতুন গতি পেয়েছে, ঠিক সেই সময় কঠোর অবস্থান জানিয়ে দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠন হামাস নিরস্ত্রীকরণ না হওয়া পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজা উপত্যকা–য় কোনো পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হবে না। তাঁর এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে এবং যুদ্ধোত্তর শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
বৃহস্পতিবার এক সামরিক অনুষ্ঠানে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, গাজায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গাজাকে “নিরস্ত্রীকরণ অঞ্চল” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া পুনর্গঠন শুরু করা হলে তা ভবিষ্যতে নতুন সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করবে। তিনি উল্লেখ করেন, এই অবস্থান তাদের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র–এর সঙ্গেও সমন্বিত।
একই দিনে ওয়াশিংটন ডিসি–তে গঠিত আন্তর্জাতিক ‘শান্তি বোর্ড’-এর প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি কাতার ও মিশর–এর মধ্যস্থতায় গত অক্টোবরে গাজায় দুই বছরব্যাপী যুদ্ধ বন্ধে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক অংশ হিসেবেই এই বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বৈঠকে প্রায় দুই ডজন বিশ্বনেতা, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক অংশ নেন এবং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল যুদ্ধোত্তর গাজার প্রশাসনিক কাঠামো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পুনর্গঠন তহবিল।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বৈঠকে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে, যা গাজায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করবে। এই বাহিনীর কাঠামো, নেতৃত্ব এবং কার্যপরিধি নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে প্রস্তাবটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে নীতিগত আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন বাহিনী গঠন করা হলে তা যুদ্ধবিরতির বাস্তবায়ন তদারকি ও অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে।
গাজার প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনায় উঠে এসেছে নানা প্রশ্ন। যুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়ে যাওয়া অবকাঠামো, হাসপাতাল, স্কুল ও আবাসন পুনর্নির্মাণের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন হবে—এ বিষয়ে সবাই একমত হলেও শর্তের প্রশ্নে মতভেদ রয়েছে। ইসরাইলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, গাজায় কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্তিত্ব থাকলে পুনর্গঠন তহবিল নিরাপদ থাকবে না এবং পুনর্গঠিত অবকাঠামো আবারও সামরিক কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। এই যুক্তির ভিত্তিতেই তারা নিরস্ত্রীকরণকে প্রধান শর্ত হিসেবে সামনে এনেছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা চলছে। তাদের মতে, হামাসের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে যাতে তারা অস্ত্র ত্যাগ করে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। তবে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিরস্ত্রীকরণের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, হামাসের জন্য এটি কৌশলগত সিদ্ধান্তের প্রশ্ন, কারণ অস্ত্র ত্যাগ করলে তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব কমে যেতে পারে।
ইসরাইল ইতোমধ্যে কঠোর বিধিনিষেধের প্রস্তাব দিয়েছে, যার মধ্যে হামাসের কাছ থেকে ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র পর্যন্ত জব্দ করার বিষয় রয়েছে। ইসরাইলি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, ছোট অস্ত্রও ভবিষ্যৎ সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে সমালোচকেরা বলছেন, এমন শর্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন এবং তা রাজনৈতিক সমাধানের পথকে জটিল করে তুলতে পারে।
গাজার দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনার জন্য গঠিত ১৫ সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি শান্তি বোর্ডের তত্ত্বাবধানে কাজ করবে বলে জানানো হয়েছে। এই কমিটির প্রধান আলী শাআত বৈঠকে অংশ নিয়ে বলেছেন, গাজার জনগণের প্রধান চাওয়া নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরে পাওয়া। তাঁর মতে, রাজনৈতিক ও সামরিক ইস্যুর পাশাপাশি মানবিক সংকট মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, কারণ যুদ্ধের ফলে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, পুনর্গঠন বিলম্বিত হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। তাদের মতে, গাজায় দ্রুত পুনর্বাসন প্রকল্প শুরু করা জরুরি, নইলে সামাজিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকট দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন রাজনৈতিক শর্তের পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অন্যদিকে ইসরাইল সরকার বলছে, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো পুনর্গঠন প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না। তাদের যুক্তি, অতীতে গাজায় পুনর্গঠনের জন্য দেওয়া আন্তর্জাতিক সহায়তার একটি অংশ সশস্ত্র কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যদিও এই অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ভিন্নমত রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি এক জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে। একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত জনগণের দ্রুত পুনর্গঠন প্রয়োজন, অন্যদিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি। ফলে গাজা প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নেতাদের সামনে কঠিন সমন্বয় সাধনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতির ইতিহাসে গাজা ইস্যু বরাবরই স্পর্শকাতর ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি সেটিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। বর্তমান আলোচনার ফলাফল শুধু গাজার ভবিষ্যৎ নয়, বরং পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে নেতানিয়াহুর ঘোষণাকে অনেকেই একটি কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখছেন, যা আন্তর্জাতিক আলোচনায় ইসরাইলের অবস্থান স্পষ্ট করে। তবে এই অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তা কতটা সমর্থন করবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। গাজার মানুষের জন্য পুনর্গঠনের পথ কত দ্রুত খুলবে, তা নির্ভর করছে কূটনৈতিক আলোচনার ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমঝোতার ওপর।