প্রকৃতি কি আর নিজের ভার সইতে পারছে? বিপন্ন ভারসাম্যে বিশ্বজুড়ে সংকেত

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ জুলাই, ২০২৫
  • ২৮ বার

 

প্রকাশ: ১৮ জুলাই | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

কিছু সময় এমন আসে, যখন প্রকৃতি কথা না বলেও চিৎকার করে ওঠে। কখনও হঠাৎ তাপপ্রবাহে মানুষ মারা যায়, কখনও হিমবাহ গলে নদীর গতিপথ পাল্টে যায়, কখনও ঝড়ের মুখে পড়ে জনপদ ভেসে যায়, আবার কখনও একফোঁটা বৃষ্টির আশায় মরুভূমিতে তাকিয়ে থাকে প্রাচীন মানববসতি। এমন ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়ে যে সংকেত ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে, তা হলো—প্রকৃতি আজ নিজের ভারসাম্য হারাতে বসেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জলবায়ুগত যে অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ছে, তা কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনাই নয়, বরং এক বৃহৎ, সুসংবদ্ধ এবং গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, চীন থেকে শুরু করে ইউরোপ ও আমেরিকা—কোথাও আর মৌসুম স্বাভাবিক নিয়মে চলছে না। বর্ষা আসছে দেরিতে, যাচ্ছে হঠাৎ করে। শীতের স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে, গ্রীষ্ম অপ্রত্যাশিতভাবে দীর্ঘ হচ্ছে। অনেক জায়গায় একদিনে কয়েক মাসের সমপরিমাণ বৃষ্টি হচ্ছে, অন্যত্র বছরের পর বছর বৃষ্টির দেখা নেই।

গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনের মাত্রা যে হারে বাড়ছে, তার ফল স্বরূপ বৈশ্বিক তাপমাত্রাও বাড়ছে অভাবনীয় হারে। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, ২০২4 সালের গ্রীষ্ম ছিল বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম উষ্ণতম। আমাজনের রেইনফরেস্ট থেকে শুরু করে আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল পর্যন্ত হিটওয়েভে পুড়েছে হাজার হাজার হেক্টর বনভূমি। খরায় ফসলহানির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা।

অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকায় উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর জন্য নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে অনিরাপত্তা। বাংলাদেশের মতো নিন্মভূমি অঞ্চলে এই পরিবর্তন বিশেষভাবে দুশ্চিন্তার কারণ। সুন্দরবনের সংরক্ষিত অঞ্চলে লবণাক্ততার মাত্রা বাড়ছে, বিপন্ন হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। হঠাৎ ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি কিংবা শুকনো মৌসুমে কৃষিভিত্তিক সমাজগুলো ভেঙে পড়ছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হয়ে।

প্রকৃতি তার নিজস্ব গতিতে চলে, কিন্তু মানুষ সে গতিতে বারবার বাধা সৃষ্টি করেছে। বন ধ্বংস, পাহাড় কাটা, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, নির্মাণের নামে অপরিকল্পিত নগরায়ন, এবং শিল্পজাত বর্জ্যের বেপরোয়া নির্গমণ—এসবই প্রকৃতির ভারসাম্য বিনষ্টের দিকে ঠেলে দিচ্ছে মানবসভ্যতাকে। আর এসব কাজের ফল আমরা এখন নিজের চোখেই দেখছি—প্রকৃতি নিজের ভার আর বহন করতে পারছে না।

জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্যানেল (IPCC) বারবার সতর্ক করে বলেছে, যদি কার্বন নিঃসরণ কমানো না হয়, তবে আগামী কয়েক দশকে বিশ্ব ভয়াবহ এক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বাস্তবভিত্তিক পরিবেশনীতি এখনও বহু দেশে অনুপস্থিত। উন্নত রাষ্ট্রগুলোর কার্বন দায় যেমন অধিক, তেমনি উন্নয়নশীল দেশগুলোও পরিবেশ রক্ষায় যথাযথ প্রস্তুত নয়।

প্রকৃতির বিপর্যয় কোনো একক জাতির সংকট নয়, এটি একটি বৈশ্বিক মানবিক সংকট। তাই এই সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজন সম্মিলিত সচেতনতা, আন্তরিকতা ও বাস্তবিক পরিবর্তন। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, পুনঃব্যবহারযোগ্য জ্বালানী, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং অরণ্য রক্ষা—এসবকে শুধুই ‘নৈতিক উদ্যোগ’ হিসেবে না দেখে, দেখা উচিত ‘বাঁচার শর্ত’ হিসেবে।

মানুষ যতই আধুনিক হোক না কেন, সে এখনও প্রকৃতিরই সন্তান। আর প্রকৃতি যদি তার ভারসাম্য হারায়, তাহলে মানবজাতির অস্তিত্বও থাকে অনিশ্চয়তার মুখে। এখন সময়—অভিনব প্রযুক্তি নয়, বরং প্রজ্ঞা, দায়িত্ববোধ ও আন্তরিকতার মাধ্যমে পৃথিবীকে পুনরায় সুস্থ করে তোলার।

প্রকৃতি আমাদের কাছে প্রতিশোধ চায় না, সে চায় বোঝাপড়া। প্রশ্ন হলো, আমরা কি তা দিতে প্রস্তুত?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত