প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জামালপুরের ব্রহ্মপুত্র নদে বৃহস্পতিবার মহান অষ্টমী স্নানোৎসবে পাপমোচনের আশায় হাজারো সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্তের ঢল নামে। প্রতিটি বয়সের মানুষ—নারী, পুরুষ, শিশু—নদীর পবিত্র জলে স্নান করে আত্মশুদ্ধির প্রার্থনা করেন। জামালপুরের ফেরিঘাট এলাকায় এই ধর্মীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। শেরপুর, টাঙ্গাইল এবং আশেপাশের অন্যান্য জেলা থেকেও বহু পুণ্যার্থী এই পবিত্র স্নানে অংশ নিতে ভিড় করেছেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি পবিত্র, যা স্নানকারীদের সকল পাপ থেকে মুক্তি দেয়। অনুষ্ঠানে ভক্তরা ফুল, বেলপাতা, ডাব, কলা ইত্যাদি অর্ঘ্য হিসেবে পিতৃকুলের উদ্দেশে অর্পণ করেন। পুরোহিতরা জানান, এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পরশুরাম পিতার আদেশে মাতৃহত্যার পাপের সঙ্গে যুক্ত। পরশুরাম পিতার নির্দেশে বিভিন্ন তীর্থে ঘুরে ব্রহ্মপুত্র নদীতে স্নান করার মাধ্যমে পাপমোচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। মনে করা হয়, নদীর পবিত্র জলে স্নান করলে পাপ নষ্ট হয় এবং আত্মা পরিশুদ্ধ হয়।
জামালপুর বানিয়াবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কিশোর কুমার দেব বলেন, “ব্রহ্মপুত্রের পবিত্র জলে স্নান করলে সব পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়—এই বিশ্বাস থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে।” প্রতিটি ভক্ত স্নানের মাধ্যমে আত্মার শান্তি এবং পরিবারের কল্যাণ কামনা করেন। নদীর তীরে ধর্মীয় গানের সুর এবং ধূপ-প্রদীপের আলো পরিবেশকে আরও পবিত্র করে তোলে।
জামালপুর সদর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান জানান, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এই পবিত্র উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্নানোৎসব শান্তিপূর্ণ ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রশাসন, স্থানীয় পুলিশ, ও স্বেচ্ছাসেবী দলসমূহ সহবিভাগে কাজ করে অনুষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করেছে।
প্রতিবছরের মতো এবারও ভক্তদের মধ্যে একটি বিশেষ ধর্মীয় অনুভূতি লক্ষ্য করা গেছে। অনেকে স্নানের আগে পিতৃকুলের উদ্দেশে প্রার্থনা করেন, কেউবা নদীর পানিতে হাত ডুবিয়ে আর্শীবাদ কামনা করেন। নদীর তীরে ভেসে আসা ফুল, ডাব এবং কলা অর্ঘ্য প্রার্থনার দৃশ্য ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে আধ্যাত্মিক উচ্ছ্বাস জাগায়।
এ অনুষ্ঠান কেবল ধর্মীয় রীতি পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সামাজিক সংহতি ও পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধকেও জোরদার করে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থীরা একত্রিত হয়ে পরস্পরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। বয়স্কদের সঙ্গে যুবক ও যুবতী, শিশুদের উপস্থিতি এই উৎসবকে আরো প্রাণবন্ত করে তোলে।
স্থানীয় মানুষরা মনে করেন, ব্রহ্মপুত্র নদীর পবিত্র জলে স্নান করে যে শুদ্ধি পাওয়া যায়, তা শুধু ব্যক্তিগত নয়, পুরো পরিবার ও সমাজের কল্যাণে প্রভাব ফেলে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ভক্তরা নদীর তীরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার চেষ্টা করেন, যাতে নদীর পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ থাকে।
পুরোহিতদের মতে, ব্রহ্মপুত্র নদীর পবিত্রতা এবং পাপমোচনের এই ঐতিহ্য যুগে যুগে প্রজন্মের কাছে সঞ্চারিত হচ্ছে। ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক প্রেরণার কারণে মানুষ এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে। অনুষ্ঠান শেষে ভক্তরা নদীর তীরে বসে প্রার্থনা ও ধ্যান করেন, যা তাদের মনকে শান্তি এবং আধ্যাত্মিক প্রশান্তি প্রদান করে।
এভাবে ব্রহ্মপুত্র নদে অষ্টমী স্নান সামাজিক ঐক্য ও ধর্মীয় চেতনাকে জীবন্ত রাখে। প্রতিটি বছরের মতো এবারও ধর্মপ্রাণ মানুষরা তাদের আত্মা পরিশুদ্ধির উদ্দেশ্যে নদীতে স্নান করে প্রার্থনা করেছেন। ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক প্রেরণার কারণে এই পুণ্যধারা দিনে দিনে আরও বিস্তৃত হচ্ছে।