প্রকাশঃ ৩১ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোর ওপর টোল আরোপের একটি পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছে। এই সিদ্ধান্তটি দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের একজন সদস্য নিশ্চিত করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জাহাজের চলাচল নিয়ন্ত্রণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি, ইরানের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় অংশ নেওয়া অন্যান্য দেশগুলোর জাহাজও টোল ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)-সংক্রান্ত বার্তা সংস্থা ফারস জানায়, নতুন টোল ব্যবস্থার পরিকল্পনা ইতোমধ্যে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচার করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশ ওমানের সহযোগিতায় এই ব্যবস্থাটি বাস্তবায়ন করা হবে। এই জলপথের গুরুত্ব আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত উচ্চ। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। তাই ইরানের এই পরিকল্পনা কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করতে পারে। পূর্ববর্তী বছরগুলোতে হরমুজ প্রণালিকে ইরান সময়-সময় কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। তবে এবার টোল আরোপের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন আন্তর্জাতিক জাহাজচালক ও বাণিজ্য সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তারা মনে করছেন, এই পদক্ষেপে সমুদ্রপথে নিরাপদ ও অবাধ চলাচলে জটিলতা তৈরি হবে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ইরানের কর্মকর্তারা জানান, নতুন টোল ব্যবস্থার উদ্দেশ্য দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এটি আন্তর্জাতিক আইন এবং মুক্ত বাণিজ্যের নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জাহাজের ওপর টোল আরোপ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি করতে পারে। অনেক দেশের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রতিক্রিয়া ও আলোচনা শুরু হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বও বিশাল। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস সরবরাহের জন্য এটি একটি প্রধান রুট। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিধর দেশগুলো এই প্রণালির নিরাপত্তা এবং মুক্ত চলাচল নিশ্চিত করতে বহু বছর ধরে কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছে। তাই ইরানের এই সিদ্ধান্ত কেবল তেহরানের জাতীয় নিরাপত্তা নীতিমাত্রার সঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতাকে সরাসরি প্রভাবিত করবে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা এবং প্রণালীতে নিরাপদ চলাচলের বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ই অপেক্ষা করছে, এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে তা কেবল আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে নয়, সামরিক কূটনীতি ও ভূ-রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলবে কি না।
সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় সমুদ্রপথে চলাচলকারী দেশগুলো সতর্ক হয়ে উঠেছে। অনেক দেশ ইতোমধ্যেই বিপদ কমাতে বিকল্প রুট ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে ইরান এই পদক্ষেপকে দেশীয় আইন ও নিরাপত্তার একটি অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
সব মিলিয়ে, ইরানের হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপের পরিকল্পনা অনুমোদন কেবল দেশীয় নিরাপত্তা নীতির নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক পরিবেশের ওপরও প্রভাব ফেলবে। সামনের দিনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এ পদক্ষেপের বাস্তবায়ন ও প্রভাব মনিটর করছেন, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে ধরা হচ্ছে।